‘যখন গেছ (অধ্যক্ষের রুমে) তখন হজম করতে পারলে না কেন? তোমার বাবাকে মাদ্রাসায় বসানোর জন্য এমন নাটক সাজিয়েছ?’ সোনাগাজী ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদদৌলার হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গেলে নুসরাত জাহান রাফিকে এ কথা বলেছিলেন ফেনী জেলার এডিএম (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) জি কে এনামুল করিম। পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে এমন কথাই জানিয়েছেন নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার। গত ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। এর আগে গত ২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতকে যৌন হয়রানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। গত ১৮ এপ্রিল নুসরাত হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার আদ্যপান্ত জানিয়েছেন তার মা ।
জবানবন্দিতে শিরিন আক্তার বলেন, রাফি দাখিল পাশ করার পর ২ বছর পূর্বে সোনাগাজী ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তি হয়। ৬ মাস পূর্বে বেলা ৩ ঘটিকার দিকে রাফি মাদ্রাসা হতে বাসায় ফিরে কান্নাকাটি করেছিল। একাধিকবার জিজ্ঞেস করার পর রাফি জানায় যে ঐদিন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজউদদৌলা তার ওড়না ধরে টান দিয়েছে।
রাফি আলিমের টেস্ট পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করার কিছুদিন আগে রাফিকে প্রিন্সিপাল সিরাজউদদৌলা নিজ রুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার কথামত কাজ করার প্রস্তাব দেয় এবং বিনিময়ে পরীক্ষার ফি দেওয়া লাগবে না ও রাফি আরো টাকা পাবে বলে জানায়। প্রিন্সিপাল রাফিকে আরো বলে যে ‘তুই তো অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলিস, আমার সাথে কথা বললে সমস্যা কোথায়।’ প্রতিউত্তরে রাফি প্রিন্সিপালকে বলে, ‘আপনি হলেন আমার শিক্ষক, বাবার মত, অন্য ছেলেদের সাথে আপনার কি তুলনা হয়।’ ঘটনাটি মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে ফিরে রাফি আমাকে বলে।
গত ২৭/০৩/২০১৯ বেলা ১১ বা সাড়ে এগারটার সময় আমি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে আমার ছেলে নোমান এর নিকট জানতে পারি যে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজউদদৌলা রাফির গায়ে হাত দিয়েছে। ঐ কথা শুনে সাথে সাথে আমি আমার ছোট ছেলে রায়হানকে নিয়ে সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসায় আসি এবং প্রিন্সিপালের রুমে যাই। প্রিন্সিপাল সিরাজউদদৌলাকে তার রুমে যেয়ে বলি, ‘কোন সাহসে তুমি আমার মেয়ের গায়ে হাত দিছ’। এ কথা বলার সাথে সাথে প্রিন্সিপাল আমাকে বলেন, ‘তুমি কোন সাহসে অফিসে ঢুকেছ, এটা অফিস রুম।’ তখন আমি তাকে বলি ‘এটা অফিসরুম নয়, এটা ব্যাভিচারের রুম’। তখন প্রিন্সিপাল কোন একজনকে ফোন দেন এবং কিছুক্ষণ পর সোনাগাজী থানা থেকে এসআই ইকবাল আসেন। থানার এসআই এসে জিজ্ঞেস করে, ‘এখানে কি হয়েছে?’ আমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালকে দেখিয়ে দিয়ে বলি যে তাকে জিজ্ঞাসা করেন। তখন প্রিন্সিপাল পুলিশকে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘এরা আমার আমার অফিসে এসে হাঙ্গামা করতেছে, নাটক সাজিয়ে।’ আমি পুলিশকে বলি, ‘ওনাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেন আমার মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে কেন ?’ একথা বলার পর প্রিন্সিপাল হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে অন্যরকম ভাব করেন। এসআই ইকবাল ঘটনা শোনার জন্য রাফিকে মাদ্রাসায় আসতে বলেন। আমার ছেলে নোমানকে ফোন করে রাফিকে মাদ্রাসায় নিয়ে আসতে বলি। নোমান রাফিকে নিয়ে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের রুমে আসলে রাফি প্রিন্সিপালকে দেখে বেহুস হয়ে পড়ে যায়। তখন এসআই ইকবাল বলে, ‘এই মেয়ে ঢং করোনা, তোমার সাথে এমন কিছু হয়নি যে বেহুস হয়ে যেতে হবে, এ গুলি আমরা জানি।’ এসআই ইকবাল ক্ষুব্ধ হয়ে রাফির মুখে জোরে পানি মারেন। রাফির হুশ ফিরলেও সে কথা বলতে না পারায় এসআই ইকবাল বান্ধবী নিশাত ও ফূর্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনা জানার চেষ্টা করেন। এসআই ইকবাল এবং মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি রহুল আমিন বলেন যে এগুলি এখানে হবেনা, থানায় নিয়ে যেতে হবে। অনুমান সাড়ে ১২টার সময় আমি আমার মেয়ে রাফি, ছেলে নোমান ও রায়হান এবং রাফির বান্ধবী নিশাত ও ফূর্তিসহ সোনাগাজী থানায় যাই। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল পিয়ন নুরুল আমিনও থানায় যায়। থানার ওসি সাহেব রাফি, নিশাত ও ফূর্তিকে তার রুমে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে আমি ওসি সাহেবের রুমে যাই এবং আমার সামনে পিয়ন নুরুল আমিনকে ওসি সাহেব জিজ্ঞাসবাদ করেন। ওসি পিয়ন নুরুল আমিনকে জিজ্ঞাসা করে যে রাফির সাথে কোন ছেলের সর্ম্পক ছিল কিনা। পিয়ন নুরুল আমিন রাফির সাথে কোন ছেলের সর্ম্পক ছিলনা বলে জানায়। ওসি সাহেব পিয়নকে বলে দেয়, তুমি কি রাফিকে প্রিন্সিপালের রুমে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলে? পিয়ন নুরুল আমিন ‘হ্যা’ বলে জবাব দেয়। এর পর রাফিকে ওসি সাহেবের রুমে একা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। থানার একজন অফিসার উক্ত ঘটনায় কম্পিউটারে এজাহার প্রস্তুত করে দিলে আমাকে উক্ত এজাহারে স্বাক্ষর করতে বলতে আমি স্বাক্ষর করি সন্ধ্যায়।
পর দিন ২৮/০৩/২০১৯ তারিখে পুলিশের কথামতো রাফিকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজি করে কোর্টে যাই। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট রাফির জবানবন্দি রেকর্ড করেন। কোর্টে যাওয়ার পথে দেখি যে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের পক্ষে সোনাগাজীতে মাদ্রাসার শিক্ষকসহ অন্যান্যরা মানববন্ধন করতেছে। এগুলি দেখে রাফি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কোর্ট থেকে ফেরার পথে আমরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে আমাদের অনুরোধে এসআই ইকবাল আমাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
৪/৪/২০১৯ তারিখে বেলা আনুমানিক ১১টার সময় আমি আমার মেয়ে রাফি, ছেলে নোমানসহ মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি এবং ফেনী জেলার এডিএম (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) জি কে এনামুল করিম সাহেবের অফিসে গিয়ে প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে অভিযোগটি জানাতে চাই। তখন এডিএম সাহেব বলেন, ‘এখন কেন এসেছেন? মামলা করার আগে আগে আসতেন তা হলে দেখতাম কি করা যায়। এখন মামলায় যা হবে তাই হবে।’ রাফি বলে, ‘আপনি আমার বাবার মতো, আপনি আমার কথাগুলো শুনেন।’ রাফি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে তার অভিযোগটি এডিএমকে জানানোর চেষ্টা করে। এডিএম সাহেব বলেন,‘ প্রিন্সিপাল খারাপ তো সবাই জানে, তুমি তার কাছে গেছ কেন?’ রাফি জানায়, ‘আমি তো ইচ্ছা করে যাইনি। পিয়নকে দিয়ে প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে।’ তখন এডিএম বলেন, ‘যখন গেছ তখন হজম করতে পারলে না কেন ? তোমার বাবাকে মাদ্রাসায় বসানোর জন্য এমন নাটক সাজিয়েছ।’ রাফি প্রতিউত্তরে বলে, ‘আমার বাবা এসবের কিছু জানে না, তাই তাকে মাদ্রাসায় বসানোর প্রশ্নই আসে না।’ এডিএম সাহেব আমাদের আরো বলেছিলেন, ‘আপনারা যে মামলা করেছেন তা প্রমাণ করতে না পারলে আপনাদের বিরুদ্ধে প্রিন্সিপালের লোকজন ৫০ লাখ টাকার মানহানি মামলা করবে।’ এডিএম সাহেবের কথা শুনে রাফিসহ আমরা মর্মাহত হয়ে ফিরে আসি।
গত ৬/৪/২০১৯ তারিখে সকাল আনুমানিক নয়টায় রাফি তার ভাই নোমানের সঙ্গে আলিম পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সোনাগাজি ফাজিল মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। এদিন সাড়ে ১০টার সময় নোমান ফোনে আমাকে জানায়, ‘রাফির গায়ে কাপড় নেই, কাপড়-চোপড় নিয়ে আসেন। রাফির গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।’ আমি রাফির কাপড়-চোপড় নিয়ে আসার আগেই রাফিকে ফেনী সদরে নিয়ে যাওয়ায় আমি সেখানে চলে যাই। পরে ঢাকায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে রাফি মারা যায়।
