উদ্বেগজনক হারে বাড়িয়া চলিয়াছে গ্যাস দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের সংখ্যা। কেবল রাজধানী ঢাকাতেই গত তিনদিনে এই ধরনের কমপক্ষে তিনটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে। মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচরে সংঘটিত এইসকল দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হইয়াছেন শিশু ও নারীসহ ১৬ জন। তন্মধ্যে গত শুক্রবার মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ীতে গ্যাসলাইনের লিকেজজনিত পৃথক দুইটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহত হইয়াছেন ১৩ জন। মাত্র একদিনের ব্যবধানে কামরাঙ্গীরচরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হইয়াছেন দুই শিশু ও এক নারী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে প্রায়শ এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। প্রধানত গ্যাসলাইন কিংবা সিলিন্ডারের ত্রুটি এবং চুলার ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ হইতে নির্গত গ্যাসই এইসকল দুর্ঘটনার কারণ বলিয়া সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বত্সরের জানুয়ারি হইতে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে গ্যাস দুর্ঘটনায় ১০৩টি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে। তন্মধ্যে ৫৫টি গ্যাসলাইন লিকেজজনিত এবং অবশিষ্ট ৪৮টি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার হইতে উদ্ভূত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসেই গ্যাসের লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ড এবং এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যু হইয়াছে সাতজনের। হতাহতের তালিকা ক্রমবর্ধমান। সংগত কারণেই উদ্বেগের পারদ চড়িতেছে।
প্রশ্ন অনেক। অভিযোগের তালিকাও কম দীর্ঘ নহে। প্রধান অভিযোগটি গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। জানা যায়, ৪০-৪৫ বছরের পুরনো গ্যাস বিতরণ লাইনও রহিয়াছে ঢাকায়। অভিযোগ হইল, ঝুঁকিপূর্ণ এইসকল গ্যাসলাইনের ব্যাপারে তেমন একটা তদারকি নাই তিতাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির। পুরনো গ্যাসলাইনের বিষয়টি স্বীকার করিলেও তিতাস কর্তৃপক্ষ অবশ্য দুর্ঘটনার জন্য মূলত অনিরাপদ অবৈধ সংযোগকেই দায়ী করিয়াছেন। তাহাদের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকও বলা যাইবে না। তবে বৈধ-অবৈধ উভয়প্রকার সংযোগ হইতেই যে দুর্ঘটনা ঘটিতেছে— তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রশ্ন আছে এলপিজি সিলিন্ডারের মান লইয়াও। ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, সিলিন্ডার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক হইলেও বাস্তবে তাহা করা হয় না। অতএব, সমস্যাটিকে যেভাবেই দেখা হউক না কেন, নাগরিকদের সচেতনতার বিষয়টিই সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠে। দেখা গিয়াছে যে, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের অসাবধানতাই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু যে বাসাবাড়িতে ব্যবহূত গ্যাসলাইন সংযোগ, এলপিজি সিলিন্ডার এবং চুলার ফিটিংস সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না তাহাই নহে, অনেক ক্ষেত্রে গ্যাসের চুলাটিও ঠিকমতো বন্ধ করা হয় না। ফলে দুর্ঘটনা অনিবার্য হইয়া ওঠে।
গ্যাসের আগুন যে কতটা বিপজ্জনক— তাহা ইতোমধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। বার্ন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণও এই ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়াছেন। তাহারা বলিয়াছেন যে, গ্যাস বিস্ফোরণজনিত আগুনে ক্ষতি বেশি হয় এবং সম্প্রতি হাসপাতালে এই ধরনের মারাত্মকভাবে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে। অতএব, সর্বাগ্রে গ্যাস ব্যবহারী নাগরিকদেরই নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন হইতে হইবে। প্রয়োজনে সহায়তা গ্রহণ করিতে হইবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হইল, এই ধরনের দুর্ঘটনারোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা।
