ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো অপরাজেয়

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৮, ২১:২৯

একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৩০ ডিসেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবারের মতো আগামী নির্বাচনও হবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বনাম অন্যদের মধ্যে। এবার অন্যদের সংখ্যা আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এই অন্যরা কারা তা পাঠকদের বোঝাতে হবে না। এদের তালিকা বেশ বড়। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি তো আছেই—তার সাথে আছে জামায়াত (যদিও এখন তারা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনহীন), আছে দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ, বেশ কয়েকটা বড় ঘরানার মিডিয়া হাউজ, পাকিস্তানের কুখ্যাত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। আছে আওয়ামী লীগের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি বড় পঞ্চম বাহিনী যারা আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থে, কোনো আদর্শগত বা নীতিগত কারণে নয়। আছেন একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা যারা সময় আসলে স্বরূপে আবির্ভূত হবেন। আছে নবগঠিত ‘শেখ হাসিনাকে ফেলে দিতে হবে’ পার্টি যার আনুষ্ঠানিক নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই শেষের দলে কারা আছেন তাদের নাম উল্লেখ না করে প্রয়াত কথা-সাহিত্যিক শওকত ওসমানের একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিতে চাই।

জামায়াতের আমীর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন এক সাংবাদিক এই বিষয়ে তাঁর মত জানতে চাইলেন এবং মনে করিয়ে দিলেন যে গোলাম আযম একজন ভাষা সৈনিক। শওকত ওসমানকে যারা চেনেন তারা জানেন তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত রাশভারি মানুষ, কথা বলতেন কম আর যখন বলতেন তা অনেকের জন্য ছিল তীরের ফলার মতো। তিনি কোনো দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলেন- ‘পতিতাও একসময় সতী ছিল’। এখন এক সময়ের এই সতীরা মিলে গঠন করেছে ‘শেখ হাসিনাকে ফেলে দিতে হবে’ পার্টি যার শীর্ষে আছেন এক সময়ের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এমন কয়েকজন ব্যক্তি। যারা এই কাজটি করার জন্য বহুদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে তারা এখন তাদের ডান হাত এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার এইসব প্রতিপক্ষকে চেনা যায় কারণ তারা ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছেন। এদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ কিন্তু সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা পঞ্চম বাহিনী। এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক, কারণ এরা হচ্ছে দলের উইপোকা আর শেখ হাসিনার চারপাশে থাকা বিষধর সাপ যাদের সম্পর্কে তিনি ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অনেকবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু এটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এইসব সতর্কবার্তা কোনো কাজে আসবে। দু’একটি পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা বলি।

এরশাদ পতনের পর এটি নিশ্চিত ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করছে কারণ সেই সময় আওয়ামী লীগই সারাদেশে একমাত্র তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠিত দল ছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের অধীনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগ শিবিরে এমন একটা ঈদের আনন্দের ঢেউ উঠলো যে মনে হচ্ছিল নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা। শুরু হলো নব্য আওয়ামী লীগারদের আনাগোনা। সকলের বিশ্বাস বিজয়তো দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে। কিছু কিছু প্রার্থীতো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই লবি করা শুরু করলো তিনি কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে বিএনপি শিবিরের চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেয়ার মতো প্রার্থীই তাদের ছিল না। একাধিক প্রার্থী, বিশেষ করে সরকারি আমলা প্রথমে শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনজোট এই অঙ্গীকার করেছিল যে এরশাদের পতন হলে তারা এরশাদ সরকারের সাথে ছিলেন এমন কোনো আমলাকে দলের মনোনয়ন দিবেন না। এমন দু’জন আমলা ছিলেন কেরামত আলী আর শামসুল ইসলাম। শেখ হাসিনা তাদের জানিয়ে দিলেন তাঁর পক্ষে তাদের মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব না। তারা গিয়ে বেগম জিয়ার সাথে যোগাযোগ করলেন এবং বেগম জিয়া তাদের লুফে নিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক যিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সকল নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন এবং নিজের ভোট ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভোট পেতেন না। তিনি বিএনপি’র প্রার্থী হলেন এবং কোনো নির্বাচনী পোস্টার না ছাপিয়ে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে হারিয়ে দিলেন। সেই নেতার পরাজয়ের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের ভিতরে অবস্থানরত পঞ্চম বাহিনী। এমন উদাহরণ অসংখ্য আছে এবং এইসব হারের পিছনে আরো যেসব কারণ আছে তা হলো- আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলের মনোনয়ন না পাওয়াদের  প্রতিপক্ষের হয়ে কাজ করা আর দলের মাত্রাতিরিক্ত আত্মসন্তুষ্টি ও গা-ছাড়া ভাব। চিন্তাটা ছিলো জিতেইতো যাচ্ছি এত কষ্ট করার কী আছে? অনেক কেন্দ্রে বেলা দু’টার পর আওয়ামী লীগের কোনো এজেন্টই ছিল না। চট্টগ্রামের একটি কেন্দ্রে দেখা গেল বিএনপি প্রার্থীর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কর্মীরা, বিশেষ করে মহিলা কর্মীরা বেলা দু’টার পর কেন্দ্র দখলে নিয়েছে এবং অধিকাংশের পরনে হয় বোরকা অথবা শাখা সিঁদুর। ক’দিন পর দেখা যাবে অনেক ব্যবসায়ী নির্বাচনের জন্য বোরকা ভাড়া দিচ্ছে। চট্টগ্রামের প্রায় সব কেন্দ্রে বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা বুকে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে যে  ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছিলো সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বা কর্মীদের কোনো খবর ছিল না। অনেক কেন্দ্রে আবার নৌকার প্রার্থীর এজেন্টরা প্রতিপক্ষের প্রার্থীর কাছে আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। আবার এমনও ঘটেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় নেতা-কর্মীরা তাদের প্রার্থীর বিজয় মিছিল বের করার জন্য পোলিং বুথকে প্রতিপক্ষের প্রার্থীর কাছে ছেড়ে দিয়ে বেলা দু’টার দিকে  প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে তাদের যে ভরাডুবি হয়ে যাচ্ছে তার কোনো ধারণা তাদের ছিল না। এইসব ব্যর্থতার দায়-দায়িত্বতো আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদেরই নিতে হবে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পিছনেও ছিল অনেকটা ১৯৯১ সালের কারণগুলোর পুনরাবৃত্তি।

আসন্ন সংসদ নির্বাচন পূর্বের যে-কোনো নির্বাচনের চেয়ে কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এর প্রধান কারণ বিএনপি’র জন্য এটা একটা অস্তিত্বের লড়াই এবং জামায়াতের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার শেষ সুযোগ। এই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট আর ঐক্যফ্রন্ট বিশাল বাজেট নিয়ে নেমেছে। এর সিংহভাগের যোগানদাতা কারা তা অনুমান করা কঠিন নয়। এর একটি বড় অংশ খরচ হবে সরকারি প্রশাসন আর আওয়ামী লীগের পুচ্ছধারী পঞ্চম বাহিনীর পিছনে। যারা মনে করেন গত দশ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলের উন্নয়নের কথা বলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারবেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। নির্বাচনে ভালো ফল করতে হলে দক্ষ সংগঠন আর কার্যকর নির্বাচন পরিচালনা পর্ষদ দরকার।

সামনের নির্বাচনটি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বেদীমূলে নিজের জীবন উত্সর্গকারী ত্রিশ লাখ শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর তেমনটি হলে তা হবে একটি জাতীয় বিপর্যয় যার ফলে দেশে আবার একাত্তরের অবস্থা ফিরে আসবে, লাখ লাখ মানুষ বাধ্য হবে দেশত্যাগ করতে যার একটি  অভিজ্ঞতা ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দক্ষিণবঙ্গে হয়েছিল। একটি বহুল প্রচারিত বিশ্বাসের পুনরুক্তি করতে চাই। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো অপরাজেয়। এই একটি বিশ্বাস আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের বিজয় লাভের অন্যতম  চাবিকাঠি।   

n লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক