দেশের প্রতিটি সেক্টর ডিজিটাল হতে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কপিরাইট-এর যাবতীয় কার্যক্রম ডিজিটাল হয়েছে। এতে করে দেশের জনগণ ভোগান্তিবিহীন সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। জনগণের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ছে আগের চেয়ে। কপিরাইট-এর যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা বলেন রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস-এর রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মাহবুব শরীফ
সৃজনকারীর সৃজনশীল কর্মের পুনরুত্পাদন করার অধিকার ও সৃজনশীল কর্মের ওপর সৃজনকারীর নৈতিক এবং আর্থিক অধিকারই কপিরাইট। এর আওতায় রয়েছে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপস, শব্দ রেকর্ডিং, নাটক, চলচ্চিত্র, কম্পিউটার গেম ও সম্প্রচার। চাহিদা অনুযায়ী এর সঙ্গে আরো অনেক কিছু যুক্ত হতে পারে। সম্প্রতি এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে আর তা হলো- স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম। কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনে নিজের ও উত্তরাধিকারীর মালিকানা স্বত্ব সুরক্ষিত হয়। এছাড়াও, আইনগত জটিলতায় মালিকানার প্রমাণপত্র হিসেবে কপিরাইট সনদ বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
এত সুবিধা থাকতেও দেশের জনগণ এর সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করতে শুরু করেনি। এ বিষয়ে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার কপিরাইট সেবাকে সহজ করে জনগণের দোরগড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের জনগণ এর সুবিধা ভোগ করতেও শুরু করেছে। তবে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে কম। ২০১৭ সালে ভারতে কপিরাইট নিবন্ধন হয়েছে ১৬ হাজার ৬শ ১৩টি, পাকিস্তানে ৫ হাজার ৫শ ৯০টি, নেপালে ৯ শতাধিক। একই সময়ে আমাদের দেশে হয়েছে মাত্র ৬শ ১৮টি।’
অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের কপিরাইট নিবন্ধন এত কম কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে জাফর রাজা বলেন, ‘এ বিষটি নিয়ে আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি যে, কপিরাইট-এর বিষয়ে সর্বস্তর পর্যায়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এছাড়াও কপিরাই আইন বা আইনের পরিভাষা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বোদ্ধ। রয়েছে আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা ও কপিরাইট নিবন্ধন বা দ্রুত নিষ্পত্তিতে যারা কাজ করছেন তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব।’
এ অবস্থায় করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন? জাফর রাজা এর জবাবে বলেন, ‘বর্তমান সময় হলো ডিজিটাল যুগ। এ সময়ে ডিজিটাল পাইরেসি খুব সহজে করা যায়। ডিজিটাল পাইরেসি প্রতিরোধ করা বর্তমান সময়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমরা ইতোমধ্যে ফেসবুক ফ্যান পেজ চালু করেছি। এখানে অংশীজন ও উত্সাহী ব্যক্তিগণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেলে এর যথাযথ উত্তর পাবেন।
তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন স্টেইকহোল্ডারদের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রযোজক সমিতি, বাংলাদেশ রাইটাস ক্লাব, বেসিস, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, আইপি ল’ইয়ার্স সমিতি, সংগীত সংশ্লিষ্ট গীতিকার ও সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের সংগঠন, সংগীত প্রকাশক সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপি বিভাগ, আইন বিভাগ, প্রিন্ট মিডিয়া বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। গত তিন বছরে আমরা এ ধরনের ১৮টি ওয়ার্কশপ করেছি।’
বিভিন্ন স্টেইকহোল্ডারদের সঙ্গে সেমিনার ও ওয়ার্কশপের মাধ্যমে আলাপ আলোচনার পর তাদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন কপিরাইট আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কপিরাইট আইনের খসড়ায়। এতে স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিষয় যুক্ত হয়েছে বলেও জানান জাফর রাজা চৌধুরী।
ই-কপিরাইট পদ্ধতিতে কপিরাইট নিবন্ধনের নতুন সুবিধাগুলো সম্পর্কে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘ই-কপিরাইট পদ্ধতিতে জনগণ আগের চেয়ে আরো সহজে কপিরাইট নিবন্ধন করতে পারবেন। বাংলাদেশে কপিরাইটের অফিস একটাই আর সেটি রাজধানীতে অবস্থিত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ যদি কোনো বিষয়ে আগে কপিরাইটি নিবন্ধন করতে চাইতেন সব ঠিক ঠাক থাকলেও তাকে অন্তত তিন বার কপিরাইট অফিসে আসতে হতো; কিন্তু এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেই রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করতে পারেন। এতে করে আবেদনকারীর সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়। শুধু তাকে কপিরাইট সনদ গ্রহণের জন্য একবার অফিসে আইলেই চলে।’
কপিরাইট নিবন্ধন পদ্ধতি ডিজিটাল হওয়াতে দিন দিন নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৮ সালে কপিরাইট নিবন্ধনের জন্য আবেদন হয়েছে ১৭৯৫টি, যা ২০১৯ সালে দুই হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আপনাদের আগামী কার্যক্রমগুলো কী কী? এ বিষয়ে জাফর রাজা বলেন, ‘চলতি বছরে নতুন কপিরাইট আইন প্রণয়নের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ১.৪ বিঘা জায়গার ওপরে কপিরাইট এর নতুন ভবনের ভিত্তি স্থাপন হবে চলতি মাসেই। কপিরাইট নিবন্ধনের একটি আধুনিক ডাটাবেজ তৈরি করার পাশাপাশি ওয়েবসাইট আপডেট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও লোক সংস্কৃতিক অভিব্যক্তি শনাক্ত, সংগ্রহণ, মূল্যায়ন ও সংরক্ষণের একটি পাইলট কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলো ও লোক ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি জাতীয় আর্কাইভ তৈরি করা হবে।’
ডিজিটালাইজেশনে সহজ হয়েছে নাগরিক সেবা
মো. আতিক উল্লাহ সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইপ্সিতা কম্পিউটার্স লি.
ই-কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের সমস্ত পদ্ধতিটি ডেভেলপ করেছে ইপ্সিতা কম্পিউটার্স লি.। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতিক উল্লাহ সিদ্দিকীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১৬ একটি নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের কাজটি গ্রহণ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘একটি সফটওয়্যারের কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করতে আমি কপিরাইট অফিসে যাই। এই কাজের জন্য আমাকে বেশ কয়েক বার কপিরাইট অফিসে যেতে হয়েছে। তখন আমি তত্কালীন রেজিস্ট্রারকে বললাম, সব কিছুই তো ডিজিটাল হয়েছে তো কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন এখনো সনাতন পদ্ধতিতে হচ্ছে কেন? তখন রেজিস্ট্রার আমাকে বললো, এটিও ডিজিটাল পদ্ধতিতে হওয়া প্রয়োজন তবে এ কাজটি করে দেবে কে? তার কথা শুনে আমি নিজেই এটি করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। রেজিস্ট্রারও আমার আগ্রহতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করতে বললেন। আমি প্রথমে একটি ডামি তৈরি করে তাদের কাছে দিলাম। আমার কাজ তাদের পছন্দ হয়েছে এবং তারা বিভিন্নভাবে আমাকে সাপোর্ট দিতে শুরু করেছে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ই-কপিরাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।’
কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হওয়াতে ১ বছরের মধ্যে নিবন্ধন আবেদনের পরিমাণ বেড়েছে ১৫০ শতাংশ । আতিক উল্লাহ সিদ্দিকী এ বিষয়ে আরো বলেন,‘ সনাতন পদ্ধতিতে একজনকে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন কতে হলে ৯ থেকে ১০টি ধাপ অতিক্রম করতে হতো। ই-কপিরাইট চালু হওয়াতে এখন এই ধাপগুলো পার করা খুব সহজ হচ্ছে। এখন আর টেবিল টু টেবিল ফাইল ঘুরছে না। এইসঙ্গে আবেদনকারীর সময় ও অর্থ বেঁচে যাচ্ছে। আগে এই কাজের জন্য একজন আবেদনকারীকে কমপক্ষে তিনবার কপিরাইট অফিসে আসতে হতো। বর্তমানে শুধু কপিরাইট নিবন্ধনের সনদ নিতে আসলেই হয়।’
আতিক উল্লাহ সিদ্দিকী মনে করেন, দেশের সকল সেক্টরের ডিজিটালাইজেশনের কাজ মাত্র ২০ শতাংশ হয়েছে। এখনো এই খাতের ৮০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। ই-কপিরাইট নিবন্ধনে যেমন গ্রাহক ভোগান্তি কমেছে ঠিক অন্য খাতেও গ্রাহক ভোগান্তি কমবে যদি খাতগুলো ডিটিটালাইজেশনের আওতায় চলে আসে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,‘দেশের সকল সেক্টর ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হলে খুব দ্রুত এর কাজ শুরু করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য দেশে প্রচুর দক্ষ লোকবল রয়েছে। তাঁদেরকে এই কাজের সুযোগ দেওয়া হলে নাগরিক সেবার মান আরো উন্নত হবে। আমাদের দেশে প্রচুর দক্ষ লোকবল রয়েছে । এ কাজের জন্য আমাদের বিদেশিদের উপর নির্ভর করতে হবে না।’
