ফাইজুল ইসলাম
শ্রীলঙ্কার তিনটি চার্চ, তিনটি অভিজাত হোটেল এবং রাজধানী কলম্বো ও এর আশেপাশের এলাকায় ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা হয়েছে গত রবিবার। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এসব হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯০ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০০ জন। এই সিরিজ হামলার মধ্যে পড়ে নিহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি জায়ান চৌধুরী (৮)। তার জামাতা মশিউল হক চৌধুরী বর্তমানে শ্রীলঙ্কার একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। আমরা নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর এইসব হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।
শ্রীলঙ্কার স্থানীয় সময় রবিবার সকাল আটটা ৪৫ মিনিটে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উত্সব ইস্টার সানডে উদযাপনকালে কোচকিকাদে, কাতুয়াপিটিয়া ও বাট্টিকালোয়া নামক স্থানের তিনটি গির্জায় বিস্ফোরণ ঘটে। প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে কলম্বোর সেন্ট এন্থনি চার্চ ও কাতুয়াপিটিয়ার সেন্ট সেবাস্থিয়ান চার্চে। প্রায় একই সময়ে দেশটির রাজধানীর অভিজাত তিনটি হোটেল সাংগ্রি লা, দ্য কিন্নামোন ও কিংসবারিতেও ঘটে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা। এএফপির খবরে বলা হয়েছে, এই বোমা হামলায় ব্রিটিশ, মার্কিন, জাপানিসহ মোট ৩৬ জন বিদেশি মৃত্যুবরণ করেছেন। দেশটিতে এখন চলছে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল ঘোষিত কারফিউ ও জরুরি অবস্থা। ধারণা করা হচ্ছে, জরুরি অবস্থার মধ্যে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারে শ্রীলঙ্কান সামরিক বাহিনী। তবে এরই মধ্যে গতকাল আবারও সেখানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
শ্রীলঙ্কায় এই হামলার দায় স্বীকার করেছে একটি জঙ্গি গোষ্ঠী তারা হলো শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনটিজে)। তবে রয়টার্স বলছে, এই হামলায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও জড়িত। গত ১১ এপ্রিল এই হামলার ব্যাপারে এনটিজের নাম উল্লেখ করে জঙ্গি হামলার সতর্কতা জারি করেছিল শ্রীলঙ্কান পুলিশ। এই সতর্কতায় বলা হয়, ‘একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) কলম্বোর ভারতীয় হাই-কমিশন ও বিখ্যাত গির্জায় আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারে।’ তবে শেষপর্যন্ত এই হামলার ঘটনা প্রতিহত করা গেল না।
প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্ব আজ যেন ভয়ানকভাবে বদলে গেছে। নাইন ইলেভেনের আগে যে পৃথিবী ছিল, সেই পৃথিবী আজ আর বিদ্যমান নেই। এই নতুন পৃথিবীর প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো ভয়, আতঙ্ক ও শঙ্কা। পৃথিবীর অনেক দেশ আজ যুদ্ধবিধ্বস্ত। কোনো কোনো দেশ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। যেসব দেশের শান্তিতে থাকার কথা, তারাও শান্তিতে নেই। বিশ্বের অন্যতম শান্তির দেশ নিউজিল্যান্ড। অথচ কিছুদিন আগে জুমার নামাজ চলাকালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে অবস্থিত দুটি মসজিদে উগ্রবাদী খ্রিস্টান জঙ্গির নির্মম বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ অর্ধশত মুসল্লি শহীদ হন। এই হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারগণ।
শুধু মসজিদে নয়, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও যে হামলা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার চার্চে হামলার ঘটনা তারই সর্বশেষ প্রমাণ। অথচ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে মনে করা হয় দুনিয়ার সবচেয়ে শান্তির জায়গা। আসলে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মই সংঘাত নয়, বরং সহনশীলতায় বিশ্বাসী। ইসলামের যুদ্ধনীতিতেও অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে হামলার কোনো অনুমোদন নেই। এমনকি কোনো পুরোহিত বা পাদ্রী, নারী, শিশু ও বৃদ্ধের ওপর হামলা চালানো যায় না। কোনো গির্জায় দেওয়া যায় না আগুন এবং উত্পাটন করা যায় না কোনো বৃক্ষ।
নিউজিল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা— এইসব সন্ত্রাসী হামলার কারণ আর যাই হোক, ধর্ম নয়। এক দেশে উগ্র খ্রিস্টান তো অন্য দেশে উগ্র মুসলিম, উগ্র হিন্দু বা অন্য ধর্মের অনুসারীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা জানি, প্রায় প্রতিটি ধর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানায়। আক্রমণের শিকার হলে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিআক্রমণের নির্দেশ দেয়। ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই এটা সম্ভব। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ন্যায় পৃথিবীর চলমান দুঃসহ ঘটনাগুলি কি কোনো ধর্মযুদ্ধ? নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ মুখ ফসকে ‘ক্রুসেডের’ কথা বলে ফেলেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি দ্বিতীয়বার এই শব্দটি আর উচ্চারণ করেননি। ধর্মের নামে বা ধর্মের আবরণে এসব হামলা-পাল্টা হামলার কথা বলা হলেও ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞগণ ভিন্ন কথাই বলেন। তাদের মতে, এসব অধিকাংশ হামলা হচ্ছে পরাশক্তিদের নিষ্ঠুর খেলার পরিণতি বা দুর্বলের ওপর সবলের ছড়ি ঘোরানোর প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ।
প্রকৃতপক্ষে সবল যখন দুর্বলের ওপর ছড়ি ঘোরাতেই থাকে, তখন দুর্বলরা অনেক সময় ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। শক্তিশালীরা অসহায় মানুষের ওপর গদা ঘুরিয়েই যাবে, তা হতে পারে না। একসময় বাঁচার তাগিদেই দুর্বলদের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে আমরা দেখছি পরাশক্তিরা দুর্বল দেশগুলির ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েই যাচ্ছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদের জন্ম নিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আবার সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে দ্বিতীয় দফায় চলছে অন্যায়-অবিচার, বিশ্বব্যাপী ঘটছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। জঙ্গি বিমান দিয়ে হামলা করা হচ্ছে। ড্রোন বিমান ও অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে। একের পর এক জনপদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর শেষ কোথায়? এইসব ঘটনার জন্য বারবার ঘুরেফিরে নাইন-ইলেভেনের ঘটনাকে টেনে আনা হচ্ছে। অথচ এই ঘটনায় তিন হাজারের মতো মানুষ মারা গেলেও তারপর আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কত লক্ষ মানুষ মারা গেছেন তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। নাইন-ইলেভেনের পর কারা কী উদ্দেশ্যে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল, তা আমাদের অজানা নয়। আফগানিস্তান যুদ্ধকে যদি কেউ নাইন-ইলেভেনের প্রতিক্রিয়া বলেন, তবে তিনি বলতে পারেন। আবার ষড়যন্ত্র তত্ত্বও হাজির করেন কেউ কেউ। বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসার সমপ্রসারণে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে দিতে সবার আগে দরকার নিজ দেশের মানুষের সমর্থন। এই সমর্থন সহজে আদায় করা যায় না বলে রণকৌশলীরা প্রায়শ ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকেন।
নাইন-ইলেভেনের পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল একের পর এক। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ে যে সাদ্দাম হোসেন ছিলেন একটি বিশেষ শক্তিশালী দেশের বন্ধু, তিনি কিনা একসময় তাদের শত্রুতে পরিণত হলেন। তালেবানরাও একসময় তাদের বন্ধু ছিল, তারপর তারা শত্রুতে রূপান্তরিত হয়। সাদ্দামের শেষ পরিণতি হলো ভয়াবহ। তিনি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুললেন। আর তার দেশটি ছারখার করে দেওয়া হলো। ইরাক যুদ্ধের পর আরব বসন্তের নামে আরবে নেমে এলো হিমবাহ। শেষমেষ সিরিয়ায় আক্রমণ করা হলো। সিরিয়ায় একশ্রেণির উগ্র গোষ্ঠীর জন্ম হলো যাদের কারণে সেইসব জনপদের অধিবাসীদের দুর্ভোগ আরো বৃদ্ধি পেল।
সিরিয়ার পর লিবিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশ আক্রান্ত হলো। এমন সব দেশে আক্রমণ করা হলো যারা একসময় ছিল অর্থবিত্তে সমৃদ্ধশালী। সেখানে স্বৈরাচারী শাসক পোক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেও একপ্রকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছিল। দেশের মানুষ খেয়েপরে ভালোই ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের পর তাদের পরিস্থিতি কী দাঁড়াল? তাদের অনেকে পথের ভিখারিতে পরিণত হলেন। ভিটেবাড়ি হারিয়ে অনেকের ঠাঁই হলো বিদেশের শরণার্থী শিবিরে। জানমালের ভয়ে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকের সলিল সমাধি ঘটল। এদিকে এসব শরণার্থীকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় দেওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। যারা যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য দায়ী তাদের মায়াকান্নাও আমরা দেখতে পেলাম। তারা মানবাধিকার রক্ষার আহাজারি করতে লাগলেন! যারা যুদ্ধ-বিগ্রহের নামে একের পর এক দেশ বিরাণ ভূমিতে পরিণত করে, তাদের মুখে আর যাই হোক মানবাধিকারের বুলি শোভা পায় না।
বিশ্বের অনেক দেশেই সংখ্যালঘুরা আজ ভালো নেই। শ্রীলঙ্কার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নানা সময়ে হামলার কথাও আমাদের অজানা নয়। আবার এই দেশটিতে উগ্রপন্থার অন্যান্য উপাদানও নিহিত। সুতরাং ঢালাওভাবে কোনো মন্তব্য করা যায় না। তবে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সবলরা যতদিন দুর্বলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ না করবে, ততদিন পৃথিবীতে নানা অশান্তি লেগেই থাকবে।
n লেখক : সাংবাদিক
