শফিউল আল শামীম
পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির কথা কমবেশি আমাদের সবারই জানা আছে। ২০১০ সালের ৩ জুন ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীতে ভয়াভহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল ১২৪টি তাজা প্রাণ। ঐ ঘটনার রেশ এখনো পুরান ঢাকাবাসীর মনে দাগ কাটে। কিন্তু একটি ক্ষত শুকানোর আগেই নয় বছরের মাথায় এসে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি তছনছ করে দিলো বহু মানুষের লালিত স্বপ্নকে। পুরান ঢাকায় থাকার সুবাদে এই অভিশপ্ত নগরীর অলিতে-গলিতে প্রায় সবসময়ই চলতে হয়। শুধু আমি একা নই, লাখ লাখ মানুষের চলাচল এই পুরান ঢাকাকে ঘিরে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ছোট কারখানা তথা আমদানি রপ্তানির আঁতুড়ঘরও এই পুরান ঢাকা। কিন্তু দিনকে দিন এই নগরী পরিণত হচ্ছে মৃত্যুপুরীতে। এখানকার রাস্তাগুলোতে প্রবেশ করা যেন নিজেকে জোরপূর্বক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। কারণ আপনি যদি কোনো যানবাহন নিয়ে এসব রাস্তায় ঢুকে পড়েন, তাহলে ফের পেছনে আসার জো হয়তো আপনার ভাগ্যে নাও জুটতে পারে। কেননা, রাস্তাগুলো এতটাই সরু যে পাশাপাশি দুটি রিকশা চলতে গিয়েও পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় কোথাও কোথাও। ভবন নির্মাণে এখানে মানা হচ্ছে না কোনো রীতি-নীতি। জায়গার মালিকরা কেউ কাউকে এক চুল পরিমাণ জায়গাও ছাড় দিচ্ছেন না। উপরন্তু পাঁচতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করছে সাত-আটতলা বিল্ডিং। পরিণামে এগুলোই হয়ে উঠছে শত শত মানুষের মৃত্যুর কারণ।
কৌতূহলবশত চুড়িহাট্টার সেই কলুষিত ওয়াহিদ ম্যানশন দেখতে গেলাম কিছুদিন পূর্বে। সেখানে যা দেখলাম তা এতটাই ভয়ানক ছিল যে, যে-কেউ দেখলেই শিউরে উঠবেন। প্রশ্ন জাগবে, কতটা ঝুঁকি নিয়ে এই অভিশপ্ত নগরীতে আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে। শুধুই কি ওয়াহিদ ম্যানশন? আশেপাশের কোন্ ভবনটি কেমিক্যালমুক্ত? রাসায়নিকে ছেয়ে গেছে পুরান ঢাকার অলিগলির প্রতিটি ভবন। অন্যদিকে প্লাস্টিকের গুদাম তো আছেই। অর্থাত্ অবস্থা এতটাই নাজুক যে, পুরান ঢাকাবাসী যেন এক-একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির উপরেই বসবাস করছেন।
এ তো গেলো পুরান ঢাকার উপাখ্যান। এবার আসা যাক আধুনিক ঢাকা তথা নতুন ঢাকার গল্পে। বনানীর এফ আর টাওয়ার এবং গুলশান কাঁচাবাজারের আগুন এ কলঙ্ক বয়ে বেড়াবে আরো বহুদিন। পর পর কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেলো ঢাকার বুকে। তদন্ত কমিটি গঠন হলো, রিপোর্টে ধরা পড়লো ভবন নির্মাণের বিভিন্ন ত্রুটির কথা। যেখানে দেখা গেলো, ভবনগুলোতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। সিঁড়িগুলো এতটাই সংকুচিতভাবে বানানো যেন এসবের প্রয়োজনই ছিল না। ধুলা, ধোঁয়া আর যানজট এ শহরের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শহর আর আমাদের ঢাকা শহরের মধ্যে তুলনা করলে যে কেউ এ শহরকে অভিশপ্ত বলেই আখ্যা দিতে বাধ্য হবেন। এমনকি বিভিন্ন জরিপে তাই উঠে এসেছে। কেননা, এই শহরের রাজপথগুলো বছরের দুই তৃতীয়াংশ সময়ই খণ্ডবিখণ্ডিত থাকে।
সড়ক দুর্ঘটনার কথা না বললেই নয়। পরিসংখ্যান বলে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয় তার অর্ধেকের বেশি এই মহানগরীতে। আরো আছে নিরাপদ পানির সমস্যা, নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব। ময়লা আবর্জনার স্তূপ, কারখানার বর্জ্য, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ইত্যাদির রোষানলে জীর্ণপ্রায় এখানকার জনজীবন। তবুও এই শহরেই মানুষের আগমন দিনকে দিন বাড়ছে একটু রুটি-রুজির আশায়। কিন্তু আশায় গুড়ে বালি দিয়ে তাদের কাউকে ফিরতে হচ্ছে অগ্নিদগ্ধ হয়ে কিংবা গাড়ির চাকায় পিষে। দিন যত গড়াচ্ছে এই শহর ততই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে মানুষের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না কোনোক্রমেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব ভোগান্তি থেকে উত্তরণের উপায় কি? এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সঠিক পরিকল্পনা। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন—পরিকল্পনা কমিশন, রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন সবাই যদি সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে তাহলে এ নগরীকে অভিশাপ থেকে অনেকাংশে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। একটি দেশের মস্তিষ্ক হচ্ছে রাজধানী শহর। আর এই মস্তিষ্ককে যদি আমরা অবহেলা করি তবে পুরো শরীরে পচন ধরবে খুব শিগগিরই। এমনকি গতিশীল বহির্বিশ্ব থেকে আমরা ছিটকে পড়বো অনায়াসে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
