অটিজম মোকাবিলায় আমাদের করণীয়

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৫

তন্বী আক্তার

অটিজম হচ্ছে বিকাশজনিত সমস্যা, যা পরিব্যাপক ধরনের হয়ে থাকে। এই ধরনের বিকাশজনিত সমস্যা প্রাক-শৈশবকাল থেকেই দেখা যায়। যেমন: সামাজিক, জ্ঞানবৃত্তীয়, যোগাযোগ ও অন্যান্য দক্ষতার বিকাশ দেরিতে হয় বা সঠিকভাবে হয় না। তবে অটিজম মানেই কিন্তু অক্ষমতা নয়। এদের মধ্যে সীমাবদ্ধতা, চ্যালেঞ্জ বা বিকাশজনিত সমস্যা থাকতে পারে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করার মত কিছুই নেই। এদের প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে বিকাশের সম্ভাবনা এবং সুপ্ত প্রতিভা। কিছু অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে অসাধারণ সামর্থ্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তবে খুব কম অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে এই ধরনের দক্ষতা পাওয়া যায়। যথাসময়ে সঠিক পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিরোধের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তিকে তার বিকাশের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে অর্জন করতে সহায়তা করা। যেমন: মেডিক্যাল, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা এবং প্রতিবন্ধকতা কাটানোর জন্য ব্যবহূত যন্ত্রপাতি, কিছু শারীরিক ব্যায়াম এবং শিক্ষার মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।

সব শিশুরই একই মৌলিক চাহিদা রয়েছে এবং নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করার সামর্থ্য অন্তর্নিহিত থাকে। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন ভালোবাসা, ভালো খাবার এবং উপযুক্ত পরিবেশের। তাদের নিজের শরীরকে এবং চারপাশের পৃথিবীতে যথাসম্ভব পরিপূর্ণভাবে জানতে সুযোগের প্রয়োজন। সময়ের পরিক্রমায় অটিজম আক্রান্ত শিশুদের পরিবর্তন ঘটে এবং শিশুদের আচরণে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ও সেইসঙ্গে নতুন নতুন সবলতা লক্ষ্য করা যায়।

অটিজম সমস্যার নিরাময় করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন অটিজম নিরাময়ের প্রয়োজনীয় ‘প্রশিক্ষণ কৌশল’ আয়ত্ত করা। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে উন্নয়ন সম্ভব। এছাড়া চারপাশের ঘটনাগুলো যদি আরো বেশি দেখে তাহলে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে এবং যদি অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়, তখন তার মন দ্রুত বিকশিত হতে থাকবে। আমরা যদি উন্নত দেশে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো সেখানে অটিজম ব্যক্তিদের উন্নয়নে রয়েছে Early intervention-এর ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। এর ফলে তারা এগিয়ে যাচ্ছে আবার অনেকেই তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে পৃথিবীতে হয়ে আছে স্মরণীয় ও বরণীয়।

উদাহরণ:১. টেমপল গ্রান্ডিন: তিনি অটিজম আক্রান্ত নারী,পশুপালনে ডক্টরেট অর্জন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং তৈরি করেছেন Squeeze machine নামে একটি যন্ত্র। এই যন্ত্রটির বৈশিষ্ট্য হলো এটি স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে চাপ তৈরি করতে পারে, যা তার আরামদায়ক শিথিলায়নে সাহায্য করতো।

২. লুইস ক্যারোল: আমেরিকার বিখ্যাত কবি, চিত্রকর ও গণিতবিদ ছিলেন। তিনি প্রথম বয়সে অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন। তার অন্যতম বইসমূহ Alice's Adventure in wonderland, The Hunting of the snark, Looking Through the Glass।

৩. লুসি ব্লাকম্যান: লুসি অটিজমে আক্রান্ত একজন অস্ট্রেলিয়ান লেখিকা। তিনি টাইপ করার মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করতেন। পরবর্তীকালে তিনি স্বাধীন একজন টাইপিস্ট হন। ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই লুসিস স্টোরি।

৪. লুসিয়ের ফ্রয়েড: একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, পরীক্ষায় সমপ্রতি যার এসপারজার সিনড্রোম ধরা পড়েছে। তিনি বলেছেন তিনি একজন Obsessive Artist ছিলেন। তিনি এজন্য ছবি আঁকাতেই অনেক মনোযোগ দিতে পেরেছেন। ফলে তিনি সফল হয়েছেন। তবে এটাও ধারণা করা হয় যে, আইজাক নিউটন, আলবার্ট আইনস্টাইন এবং মেরি কুরি প্রমুখ ব্যক্তির মধ্যেও কিছু অটিস্টিক লক্ষণ ছিল।

আমেরিকাতে “Families and School Together” প্রোগ্রামটি ব্যাপক কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে প্যারেন্ট ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং, প্যারেন্ট চাইল্ড ইন্টার একশন থেরাপিসহ আরো নানাবিধ কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এমন রেওয়াজ নেই বললেই চলে; নেই কোনো সচেতনতা। যদিও বা শহরে কিছু শিক্ষিত পরিবার রয়েছে, যারা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কিন্তু গ্রামে এই বিষয়ে নেই কোনো সচেতনতা বা অটিজম বিষয়ে যুগোপযোগী জ্ঞান। যেহেতু আমাদের দেশ উন্নয়নশীল, সুতরাং নিরক্ষরতা, দরিদ্রতা, সুশিক্ষার অভাব বিদ্যমান। তাই অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়ে রয়েছে সহস্র কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা।

মিডিয়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়নমূলক বিভিন্ন সংঘ, পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে অটিজমের সক্ষমতার বিষয় এবং অটিজম কি ও কি করণীয় তা তুলে ধরতে হবে যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে, আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো তারাও পারবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়