সোহেল দ্বিরেফ
যে দেশটি নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, স্বপ্ন দেখি অথচ আজ সেই দেশটির বর্তমান চেহারা দেখলে বড়ো কষ্ট লাগে। একের পর এক বিপদ যেন বাংলাদেশের পিছু ছাড়ছে না! সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ইত্যাদি যেন আমাদের নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কেউ আজ নিজেকে নিরাপদ ভাবার সাহস পাচ্ছে না। রাস্তায় বের হলে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়, অফিস বা ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা রাস্তায় যৌনহয়রানির ভয়! এভাবে ভয়ে ভয়ে আজ আমাদের দিন পার করতে হয়! আমরা আর কবে সচেতন হব? কবে নিজেদেরকে উন্নত বা শান্তিপূর্ণ জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে পারব? আমরা কি ভুলে গেছি সেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা, যেখানে ত্রিশ লাখ শহীদ এবং সাড়ে তিন লাখ মা-বোন তাদের ইজ্জত্ বিলিয়ে দিয়েছিল! এই দেশকে রক্ষা করার জন্য সেই মা-বোনেরা ঐ পাকিস্তানি নরপশুগুলোর মুখের খাবারে পরিণত হয়েছিল। তবুও তারা চেয়েছিলেন এই দেশটি স্বাধীন হোক। পরবর্তী প্রজম্ম যেন তাদের ন্যূনতম সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে। তারা তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন; কিন্তু তাদের চাওয়াটা আজো পূরণ হলো না! এর থেকে আমাদের জন্য আর বড়ো দুঃখের কি হতে পারে! তবে কি সবকিছুই বৃথা গেল! নবরূপে জেগে ওঠা এই পশুদের ছোঁবল থেকে আমাদের মা-বোনদের কি নিরাপদ রাখতে পারবে না? কবে আমাদের মনের মধ্যে সেই বিবেকবোধ জাগ্রত হবে? দুইদিন আগেও যখন আমি লালবাগ গিয়েছি নিজের ছোটো বোনকে নিয়ে, তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু বখাটে অশালীন মন্তব্য করছিল। সেখানে আমার কি করার ছিল, কিছুই না। কারণ সেই এলাকায় আমাকে প্রতিদিনই যেতে হয়। কিছু বলতে গেলে তারা পরবর্তীকালে বড়ো কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে, এজন্য বিষয়টা তখন এড়িয়ে গেছি। তখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছিল! কিন্তু কি করার আছে, ওদের সঙ্গে কোনোভাবেই পারা সম্ভব নয়! এভাবে আরো কত বোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত এসব যৌনহয়রানির শিকার হচ্ছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। গতবছরটি আমাদের জন্য আরো খারাপ স্মৃতিগুলো বহন করে আছে, যেমন বাসে মাজেদার ধর্ষণসহ একাধিক এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। তার ধারাবাহিকতায় এবছরও সেই প্রেতাত্মারা যেন সজাগ হয়ে উঠছে! কিন্তু এভাবে আরো চলতে থাকলে একসময় মানুষ এদের অত্যাচারে গৃহবন্দি হয়ে থাকার চিন্তা করবে যেটা কোনো সমাধান নয়। মেয়েদের জন্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে বিশেষ করে মার্কেটে, রাস্তায়, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা বা মক্তবে— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা এসকল অনৈতিক কাজগুলো ঘটিয়ে থাকে অথবা সহযোগিতা করে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেন অন্যরা তাদেরকে দেখে শিক্ষা নিতে পারে। পরবর্তীকালে এমন কাজ করতে গেলে তাদের বুকটা একবার হলেও যেন কেঁপে ওঠে। আমরা চাইলেই ছোট্ট দেশকে ফুলের বাগানের মতো সাজাতে পারি। প্রয়োজন শুধু সবার নিজ জায়গায় থেকে নিজ দায়িত্বটুকু পালন করা এবং ভালোভালো কাজে অন্যকে উত্সাহ দেওয়া। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে সমাজ এমনি এমনি বদলে যাবে।
n লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
