স্বামীর দেওয়া আগুনে মারা গেলেন শাহিনুর

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৪৮

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি ও কমলনগর সংবাদদাতা

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় স্ত্রীর স্বীকৃতির দাবিতে শরীরে আগুন দেওয়া শাহিনুর আক্তার সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে   মারা গেছেন।  রবিবার তাকে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

শাহিনুর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সোনাগাজী গ্রামের জাফর আলমের মেয়ে। দেড় বছর আগে চট্টগ্রামে রিকশা চালক সালাহ উদ্দিনকে প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে বিয়ে করেন। এরপর থেকে সালাহ উদ্দিন তাকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দিচ্ছিলেন না। পরে খুঁজে শাহিনুর হাজির হন কমলনগর উপজেলার আইয়ুবনগর এলাকার সালাহ উদ্দিনের বাসায়। এক পর্যায়ে বাসা থেকে শাহিনুরকে টেনে হিঁচড়ে বের করে পাশের সয়াবিন খেতে নিয়ে যান সালাহ উদ্দিন। সেখানে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা শাহিনুরকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশ। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। গতকাল সকাল ১১টায় শাহিনুরের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার স্বামীর ঘর করা আর হলো না।

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত সালাহ উদ্দিন পালিয়ে যায়। তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এ ঘটনায় সালাহ উদ্দিনের ২ ভাই, স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজ উল্লাহ ও গ্রাম পুলিশ আবু তাহেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। অভিযুক্ত সালাহ উদ্দিন চর ফলকন গ্রামের মহর আলীর ছেলে। তার বাড়ি নদীতে ভেঙে যাওয়ায় আইযুবনগর এলাকায় ঘর জামাই থাকেন। তার স্ত্রী ও এই ঘরে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। তিনি পেশায় একজন রিকশা চালক। চট্টগ্রামের রাউজানের সোনাগাজী গ্রামের শাহিনুরের বাবা জাফর  আলমকে খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি বাদী হয়ে কমলনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করবেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুর স্ত্রীর দাবি নিয়ে আয়ুবনগরের মহর আলীর ছেলে রিকশাচালক সালাহ উদ্দিনের কাছে আসেন। শনিবার বিকাল থেকে স্ত্রীর স্বীকৃতি চেয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেন শাহিনুর। কেউই তার সেই দাবি একবারও শোনেননি। সালাহ উদ্দিনের বাসায় একবার যান তিনি। স্ত্রীর দাবি নিয়ে কথা বললে তাকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে তাড়িয়ে দেন সালাহ উদ্দিন। শনিবার রাতে কোথায় যাবেন-তা নিয়ে শাহিনুরের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। পরে সালাহ উদ্দিনের বাড়ির পাশে এক নারীর বাড়িতে কোনো রকম রাত কাটান। রবিবার সকালে তিনি গ্রাম পুলিশ আবু তাহেরের কাছে যান। তার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে ছুটে যান স্থানীয় চর ফলকন ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওর্য়াডের হাফিজ উল্লাহ মেম্বারের বাড়িতে। সেখানে তিনি সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীর দাবি তুলে মোবাইল ফোন থেকে বেশ কিছু ছবিও দেখান। মোবাইল ফোনে তাদের কথোপকথনও শোনানো হয় হাফিজ মেম্বারকে; কিন্তু হাফিজ মেম্বার সাফ জানিয়ে দেন যে, বিয়ে যদি হয়ে থাকে, তার কাগজপত্র দেখাতে হবে। কাগজপত্র পেলেই তিনি এ ব্যাপারে সালিশে বসবেন।

রবিবার বিকালে শাহিনুর শেষবারের মতো স্ত্রীর দাবি নিয়ে সালাহ উদ্দিনের বাসায় যান। সেখানে তিনি স্ত্রীর দাবি তুললে, সালাহ উদ্দিন ও তার দুই ভাইয়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। আশেপাশের বাড়িঘর থেকে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়। এক পর্যায়ে শাহিনুরকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে। তাকে জোর করে বাসা থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেওয়া হয়। 

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকা অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ শাহিনুর চিকিত্সকের সামনে কিছু তথ্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘মোবাইলে তার সঙ্গে সালাহ উদ্দিনের পরিচয়। পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দেড় বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় সালাহ উদ্দিন প্রথম স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন রাখে। বিষয়টি জানতে পেরে আমি  কমলনগরে এসে স্ত্রীর স্বীকৃতি চাইলে সালাহ উদ্দিন বাড়ির পাশের সয়াবিন খেতে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়।’

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক আনোয়ার হোসেন বলেন, দগ্ধ তরুণীকে হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হয়।

খবর পেয়ে সদর হাসপাতালে শাহিনুরকে দেখতে যান পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সফিউজ্জামান ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুজ্জামান। তাদের কাছে শাহিনুর তার গায়ের আগুন ধরিয়ে দেওয়ার তথ্য জানিয়েছেন।