তৌহিদুল হক
সমাজের মূল শক্তি মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক। মানুষের মধ্যকার সম্পর্কই সমাজে শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কিংবা যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে শ্রেণিতফাত্ থাকলেও সম্প্রীতির বন্ধনে সবাই নিজেদের এক বৃহত্ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত করার সুযোগ পায়। এই বৃহত্ পরিবারের নাম সমষ্টি চেতনা।
বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে এই সমষ্টি চেতনার আদর্শিক অবস্থান বিচ্যুত ভূমিকায় রূপায়িত যা সমাজের অবস্থান ও মানুষে মানুষে বন্ধনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করছে। মোটাদাগে এরকমই বিষয় হলো— নারী নির্যাতন, হত্যা, অপহরণ ও ধর্ষণ। একটি সমাজে নারী নির্যাতন ও নির্যাতনের বিভিন্ন ধরন ও ক্ষেত্রগুলো যখন বেড়ে যায় তখন বুঝতে হবে সমাজের প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সামাজিক প্রবৃদ্ধি পরিমাপে সমাজে বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের ভূমিকার প্রশ্নটি জোরেশোরে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে।
এরই ধারাবাহিকতায়, ফেনীর নুসরাত জাহান রাফিসহ চলতি সময়ে নির্যাতিত নারী ও কন্যা শিশুর ওপর চালিত বর্বরতায় সমাজের শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও নিজেদের অম্লানে মেলে ধরেছে। সমাজে সম্পর্ককেন্দ্রিক উন্নয়নে বর্তমানে এটি সবচেয়ে বড়ো বাধা। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় ‘না’ বলার তথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর অতীতের মতো সুরেলা নয় বরং পুলিশ, প্রশাসনিক ব্যক্তি, রাজনৈতিক আদর্শে প্রাণিত ব্যক্তি— সবাই মিলে রাফিকে হত্যার আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের সমাজের জন্য এটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এটি সমাজের মানুষের ভূমিকাকেন্দ্রিক বিচ্যুতি।
চলতি সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুনলোতে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলছে। স্বয়ং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণি বিভাজন বর্তমান অবস্থার পশ্চাতে মূল কারণ উত্পাদন করে। কারণ, আমাদের এখানে সমন্বিত সামাজিকীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অগ্রসর করার মানবিক পদচারণা। ফলে মানুষের জন্য মানুষের অগ্রসরতা আজ বাণিজ্যের দাপটে সংকটে পরিণত কিংবা অন্যকোনো স্বার্থকেন্দ্রিক আচরণে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সমাজে সংঘটিত নারী নির্যাতনের ঘটনা কয়েক ধরনের ক্ষেত্র তৈরি করে। নির্যাতিত নারীদের স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ পরিচালনায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কী ধরনের কর্মসূচি রয়েছে, তা বিবেচ্য। কারণ নির্যাতিত নারীদের পাশে অবস্থানগত কারণে রাষ্ট্রের সহমর্মিতা মূল শক্তির প্রেরণা দেয়। যেমনটি আমরা দেখছি রাফির ক্ষেত্রে, বর্তমান সরকারপ্রধানের প্রবল সদিচ্ছা।
সরকারপ্রধান যখন রাফি হত্যার বিচারে সোচ্চার তখনি রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ভূমিকা নিয়ে হাজির। এর মাধ্যমে দুটি বিষয় নিশ্চিত সহকারে প্রমাণিত। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকে। এই অপেক্ষা থাকার পেছনে কারণ হলো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ও আচরণ দ্বারা বশীভূত হওয়া। অন্যটি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন। বাংলাদেশের সমাজ প্রক্রিয়ার অনুন্নয়নের পিছনে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার অন্যতম বাধা। অতি রাজনীতি কখনো কল্যাণ নিয়ে আসে না।
বাংলাদেশের নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনাগুলো বিচার বিশ্লেষণে যে বিষয়টি প্রতীয়মান, একজন ব্যক্তি যখন মনে করে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে তখনি অপরাধের ক্ষেত্র ও অপরাধী অপরাধপ্রবণতা একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। এই ক্ষেত্রগত মিলনই অপরাধ সৃষ্টির বিভিন্ন কারণ তৈরি করে।
একটি অপরাধের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সমাজে সম্মানের দিক থেকে যেভাবে বিবেচ্য হয় তা মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও নাগরিক উদ্যোগ জরুরি। বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার নারী সমাজে পুনঃসম্পর্ক স্থাপনে অনেক কাঠখড় পেরিয়ে আসতে হয়। বিশেষ করে সমাজ তাকে বাঁকা নজরে দেখে এবং পরবর্তীতে বিবাহকেন্দ্রিক সম্পর্ক স্থাপনে সমাজের অন্যজন সংঘটিত ঘটনার বা অপরাধের বিবরণ ও বিশ্লেষণ মনে রাখে। যা বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সামাজিকীকরণে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।
যে কোনো সমাজের মানবিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনার মূল যে প্যারামিটার কাজ করে তা হলো— ঐ সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা সমস্যাক্লিষ্ট ব্যক্তির পাশে কতটা মানবিক পরিচয়ে পরিচিত। এরই পরম্পরায়, মানবিক আন্দোলনে বাংলাদেশের অবস্থান শুরু করেও শুরু হচ্ছে না বরং পিছিয়ে যায় বারে বার। তবুও আমাদের প্রত্যাশা আর কোনো ঘটনা যেন নুসরাতের মতো না হয়।
লেখক: অপরাধ ও সমাজ গবেষক এবং সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
