মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রতিবেশী দেশগুলো কী করছে, তাতে নজর না দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের এগিয়ে আসার তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এ সময় তিনি দেশের তরুণদের দক্ষ জনসম্পদ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির বাজারে আজকের তারুণ্য আগামীর মূল চালিকাশক্তি’। রবিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং সামিটের চতুর্থ আসর উদ্বোধন করতে এসে তিনি এ কথা বলেন।
সজীব ওয়াজেদ আরো বলেন, ‘আমি বিপিও সেক্টরে কাজ করা তরুণ-তরুণীদের নিয়েও গর্ববোধ করি। এই স্মার্ট তরুণরা ভবিষ্যত্ এখন নিজেরাই গড়ে নিচ্ছে নিজেদের মেধার বলে। তারা এখন সরকারি চাকরির অপেক্ষা করছে না। গতানুগতিক চাকরির জন্য কিন্তু তারা বসে নেই। তারা তাদের পেশার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা আগে কখনো বাংলাদেশে ছিল না।’
তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের উদ্দেশ্যে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘দেশকে কীভাবে ডিজিটাইজড করতে হবে, এ বিষয়ে কোনো দেশেরই কোনো পরিকল্পিত রূপকল্প ছিল না। অনেক দেশ এটাকে অর্গানিক্যালি করেছে। প্রতিটি দেশের সমস্যা ও সম্পদ সম্পূর্ণ আলাদা। তাই আপনাকে থাকতে হবে নির্দেশকের ভূমিকায়। আর আমরা তা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি। তাই আপনাদের প্রতি আমার বার্তা হলো—আপনারা নতুন কিছু উদ্ভাবন করুন, নতুন প্রযুক্তি খুঁজুন। আপনারা কেউ অনুকরণ করবেন না, উদ্ভাবন করুন। আর এটাই আমার লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, আগামীতে হাইটেক সেক্টরে কাজ করবে বাংলাদেশের তরুণরা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অংশ নয়, নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানেও আসবে বাংলাদেশ।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দেশের বাণিজ্যিক সেবাখাতকে এবার বিপিও সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপিও খাতের সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ব্যাংকিং ও টেলিকম খাতসহ আরো অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তা নিচ্ছে না। আমি বলছি, এখন বিপিও খাতের সে সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। বিপিও খাতকে এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নজর রাখতে হবে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) আয়োজিত বিপিও সামিটের চতুর্থ আসরের উদ্বোধনী দিনে এসেছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব এন এম জিয়াউল আলম, ডাক ও টেলিকম সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক, হাইটেক পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম ও বাক্যর সভাপতি ওয়াহিদ শরীফ।
বিপিও সামিটে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে
বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৯ এর আয়োজনে প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে সামিট জুড়ে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ দর্শনার্থীদের ভিড়। আবার অনেকে জেনে নিচ্ছেন আউটসোর্সিং খাতের অজানা তথ্য। সেমিনানেও অংশ নিতে দেখা গিয়েছে অনেক শিক্ষার্থীদের । এবার সামিট থেকে বেশ কিছু চাকরি দিবে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। সে জন্য তারা সামিট থেকেই সিভিও সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিভিন্ন সেমিনার
‘ফ্রিল্যান্সার টু এন্টারপ্রেনিওর’ শিরোনামের একটি সেমিনার বেশ গুরুত্ব পেয়েছে এবারের বিপিও সামিটে। এছাড়াও, ‘ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বিপিও: ইমাজিং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি ট্রেন্ডস’ ‘হেলথ্ কেয়ার আউটসোর্সিং’ ‘রুরাল বিপিও: দ্য নিউ হরিজন অব ইমপ্লয়মেন্ট ফর ইয়ং ভিলেজার্স অব বাংলাদেশ’ ‘অপোরচুনিটিস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব উইমেন ওয়ার্কিং ইন বিপিও’ ‘আউটসোর্সিং টেলিকমিউনিকেশন ’ শীর্ষক সেমিনারগুলো বেশ গুরুত্ব পেয়েছে এবারের বিপিও সামিটে।
বিপিওতে কাজের সুযোগ
‘বিপিও এজ এ ক্যারিয়ার ফর ইয়ুথ অ্যান্ড লেবারজিং বিপিও ফর ইমপ্লয়মেন্ট’ শিরোনামের সেমিনার প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বিপিওতে চার হাজার ৮শ রকমের কাজ রয়েছে। আমাদের তরুণরা যে এর মধ্যে কোনো একটি কাজ করতে পারবে না এমন নয়। সে জন্য চাই নিজের প্রচেষ্টা।’ পরবর্তীত সময়ে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্সের মহাসচিব জেমস পয়সান্ট তার বক্তব্যে তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘পেশা কী হবে সেটা নিজের কাছে। তবে যেটাতে আপনি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন সেটাই পেশা হিসেবে নেওয়া দরকার। বিপিওর কথা বলতে গেলে, এটা সম্পূর্ণই একটা আনন্দদায়ক মনোভাবে থাকার পেশা। ইন্টারনেট আমরা সবাই ব্যবহার করি। কিন্তু সেটা কোন্ উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করছি সেটাই মুখ্য। আমরা এখন সবকিছুই ইন্টারনেটেই পাই। তাই এটাকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে হবে।’
নাগরিক সেবায় ৯৯৯ এবং ৩৩৩
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা নিতে একটি নীতিমালা করতে যাচ্ছে সরকার। বিপিও সামিটের প্রথম দিন ‘গভার্নমেন্ট প্রসেস আউটসোর্সিং: স্টেপস ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য জানান।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক পার্থ প্রতীম দেব। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকার ৫৪টি ডিজিটাল সেবা প্রদান করছে । এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো সেবা আউটসোর্সিং করা যাবে আর কোনোটা করা যাবে না তার তালিকাও থাকবে নীতিমালায়। পার্থ প্রতীম দেব বলেন, তারা আউটসোর্সিংয়ের নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি করেছেন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে এটি চূড়ান্ত করবেন। নীতিমালাটি হয়ে গেলে তখন সরকারের অনেক কাজই বেসরকারি কোম্পানিগুলো করে দিতে পারবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সরকারি সেবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে হজ ব্যবস্থাপনা অন্যতম। তাছাড়া সেবা হিসেবে ৯৯৯ এবং ৩৩৩ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ আরো কিছু সেবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়ে আসতে পারলে তা জনগণের অনেক কাজে লাগতো এবং তাতে সরকারের খরচও কমতো। তবে খুব বেশি সরকারি সেবা আউটসোর্সিংয়ে না যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতাকেও দায়ী করেন। একইসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বেসরকারি খাতকে আহ্বান জানান আমলাদের মানসিকতা পরিবর্তনে সহায়তা করতে।’
