যাহা চাই তাহা পাই না

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৩৭

g চিররঞ্জন সরকার

পলাশির যুদ্ধে পরাজিত বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার কীর্তি-কাহিনি কম-বেশি আমরা সবাই জানি। মীরজাফর, উমি চাঁদ, জগত্ শেঠ, ঘসেটি বেগমদের ষড়যন্ত্রের কারণে সিরাজ উদ দৌলাকে পরাজয় বরণ করতে হয়। সিরাজের মতো দেশপ্রেমিক নেতা বাংলায় বার বার ফিরে আসুক—এটাই আমরা যুগ যুগ ধরে কামনা করেছি। সম্প্রতি আমরা আরেকজন ‘সিরাজ উদ দৌলা’র সন্ধান পেয়েছি। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের যিনি নাটের গুরু। ওই হত্যাকাণ্ড মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে ঘটেছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)! আমরা কি এমন সিরাজ উদ দৌলাকে চেয়েছিলাম—যে কি না লাম্পট্য ও খুনের দায়ে অভিযুক্ত হবে? এই সিরাজ উদ দৌলা যেন আমাদের প্রত্যাশার মুখে একটা বড়ো ধরনের চপেটাঘাত!

আসলে আমাদের চাওয়া-পাওয়াগুলোর মধ্যে তেমন কোনো মিল নেই। আমরা চাই, সুখী-সুন্দর সম্প্রীতির একটি দেশ। যেখানে হানাহানি মারামারি থাকবে না, যেখানে গণতন্ত্র থাকবে, সুশাসন থাকবে। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে; কিন্তু কোনো বিদ্বেষ এবং ঘৃণা থাকবে না। এখানে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে কোনো ধরনের হয়রানি-নির্যাতন থাকবে না, যে সমাজ হবে সম্প্রীতির-সহযোগিতার-সহমর্মিতার। কিন্তু চাইলে কি হবে, এর মধ্যে ঠিকই পলাশীর সিরাজ উদ দৌলা নয়, ফেনীর ‘সিরাজ উদদৌলা’রা প্রবল হয়ে ওঠে। আসলে আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে তেমন কোনো সামঞ্জস্য নেই।

দোষ আসলে আমাদেরই। আমরাই কেন জানি কেবল ভালো ভালো জিনিস চাই, ভালো মানুষের সমাহার চাই। আর এতে করে প্রতিনিয়ত ঠকতে হয়। আমরা যদি সীমিত চাওয়া-পাওয়ায় অভ্যস্ত হতে পারতাম তাহলে হয়তো না-পাওয়ার বেদনাগুলো এত প্রকট হয়ে দেখা দিত না!

অবশ্য এটা মানবজাতিরই সমস্যা। মানুষের অভাব বা চাহিদার কোনো শেষ নেই। একটা অভাব মিটলে কিংবা একটা চাহিদা পূরণ হলেই আরেকটা সামনে চলে আসে। সেটা পূরণ হলে আরেকটা। এভাবে চলতেই থাকে। মানুষের মন কখনো কোনোকিছুতেই তৃপ্ত বা সন্তুষ্ট হয় না। সবার মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটা দীর্ঘশ্বাস—আহা! আমার যদি এটা থাকত। আহা! আমার যদি ওটা হতো। এই এটা-ওটা-সেটার চিন্তাতেই মানুষের জীবন কেটে যায়; কোনো না কোনো অভাব বা অতৃপ্তি নিয়েই মানুষকে কবরে কিংবা চিতায় যেতে হয়। মানুষের চাহিদা অসীম হলেও সবার চাহিদা বা অভাব এক রকম নয়। আমাদের সমাজে মানুষ যেমন বিচিত্র, বিভিন্ন মানুষের অভাব বা চাহিদাও তেমনি বিচিত্র। তবে সাধারণত কেউই অল্পে তুষ্ট হয় না বা হতে চায় না। একজন নিরন্ন মানুষকে তার চাহিদার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে, দুবেলা দুমুঠো খাবার পেলেই সে সন্তুষ্ট। তার এই চাহিদা পূরণ করুন, এরপর সে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চাইবে। সেটা পূরণ হলে চাইবে একটু মোটা কাপড়ের ব্যবস্থা। এই চাহিদা পূরণ হলে সে চাইবে একটু বিনোদনের ব্যবস্থা। এভাবে একপর্যায়ে মোটা ভাত, মোটা কাপড় ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দাবি ত্যাগ করে ক্রমেই সে ভালো পুষ্টিকর খাবার, আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা, আকর্ষণীয় পোশাকের দাবি তুলবে। তার দাবি ও চাহিদা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। এভাবে মানুষের চাহিদার কোনো শেষ নেই। আর যে যত বেশি পায় সে তত বেশি চায়।

একজন বেকারকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কী চাও? সে উত্তরে বলবে, যে কোনো ধরনের একটা চাকরি চাই, কাজ চাই। বেতন যাই হোক, কোনো আপত্তি নেই। এরপর কাজ বা চাকরি পেলেই তার চাহিদা বাড়তে থাকে। কেন বেতন বাড়ে না, প্রমোশন হয় না—এসব নিয়ে তার মনোবেদনা ও আফসোসের কোনো সীমা থাকে না।

তবে সবার চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা একরকম নয়। গরিবের এক রকম চাহিদা, আবার বড়ো লোকের আরেক রকম। নেতার চাহিদা এক রকম, জনতার আরেক রকম। বিভিন্ন জনের চাহিদার মধ্যে রকমফের আছে। তারতম্য আছে। কোটিপতি সারাক্ষণ আরো বেশি টাকার স্বপ্ন দেখে এবং যে কোনো উপায়ে সেই টাকা উপার্জনের চেষ্টা করে। আবার হাভাতের স্বপ্নজুড়ে কেবল থাকে খাবার। কাড়ি কাড়ি ভাত।

কেউ টাকা চায়, কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ নারী চায়, কেউ চায় সুরা। আবার কেউ দামি বাড়ি-গাড়ি চায়, কেউ আমোদ-ফুর্তি করার সুযোগ চায়, কেউ খ্যাতি চায়, কেউ চায় ক্ষমতা, কেউ চায় দেখিয়ে দিতে, প্রতিশোধ নিতে। কেউ-বা চায় ভালোবাসা। অনেকে আবার যে কোনো উপায়ে বিখ্যাত বা আলোচিত হতে চায়। কেউ কোলাহল চায়, কেউ চায় নির্জনতা। কেউ চায় বন্ধন, কেউ-বা মুক্তি। কারো পছন্দ কাজ, কারো আবার অলসতা। কেউ চায় ব্যথা দিতে আবার অনেকে ভালোবাসে ‘কষ্ট পেতে’। কেউ গান শুনতে পছন্দ করে, আবার কেউ পছন্দ করে গান গাইতে। কেউ কবিতা লিখে আনন্দ পায়, কেউ কবিতা পড়ে আনন্দ পায়। অনেকে কবিদের গালাগাল করে আনন্দ পায়। অনেকে আবার ছাপার অক্ষরে নাম প্রকাশ করতে কিংবা টিভিতে একটু চেহারা দেখাতে পছন্দ করে। মোট কথা, মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো শেষ নেই। এই চাওয়া বিচিত্রও বটে। মানুষের আকাঙ্ক্ষার এই ভিন্নতা প্রসঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন— ‘কেউ হাসি চায়, কেউ ভালোবাসা, কেউ চায় মিঠে কথা/কেউ চায় ফের নয়নের জল, কেউ চায় এর ব্যথা’। কেউই তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে, পদ-পদবি-ক্ষমতা নিয়ে সুখী নয়।

মানুষ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতা হলো আমাদের জীবনের বেশিরভাগ চাহিদাই পূরণ হয় না। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে আমাদের জীবনে হাহাকারের কোনো শেষ নেই। একটা অতৃপ্তি, নেই নেই ভাব, না পাওয়ার বেদনা প্রতিনিয়ত আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। সে জন্য বিরহের গান আমাদের দেশে বেশি জনপ্রিয়। যার কোথাও কেউ নেই, কোনোকালে কেউ ছিল না, সেও মাঝে-মধ্যেই আনমোনা হয়ে যায়। যেন জীবন থেকে পরম কাঙ্ক্ষিত কেউ চলে গেছে, একটুর জন্য ‘কি না হইতে পারিত’ গোছের কেউ হারিয়ে গেছে—এমন একটা ভাব নিয়ে বেঁচে থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে আমাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, অভিযোগ-অনুযোগ অনুতাপের কোনো শেষ নেই। ওসব করে কোনো লাভ হয় না, প্রতিকার পাওয়া যায় না। তারপরও আমরা সেসব করি।

আমাদের দেশে যারা সাধারণ মানুষ, তাদের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ-দুঃখ-বেদনার কাহিনি অবশ্য কেউই জানতে বা শুনতে চায় না। সাধারণ মানুষ হচ্ছে আমজনতা। আম যেমন একগাছে শত শত হাজার হাজার থাকলেও তাদের কোনো চাহিদা বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম নেই, আমজনতাও ঠিক তাই। আলাদাভাবে আমের দাম থাকলেও তা জনতার সামনে বসে যখন ‘আমজনতায়’ পরিণত হয় তখনই তার দাম, গুরুত্ব, উপযোগিতা হ্রাস পায়। এতে বোঝা যায় যে, জনতা বা মানুষের দাম আমাদের সমাজে ফল-মূলের চেয়েও কম। কাজেই চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। রবি ঠাকুরের বাণীই আমাদের অমোঘ নিয়তি—যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না। ... তা কী সমাজে, কী রাজনীতিতে, কী ব্যক্তিগত জীবনে।

n লেখক : রম্যরচয়িতা