আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
পাসপোর্ট একজন মানুষের নাগরিকত্ব প্রমাণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দলিল। এই দলিল না হলে একজন মানুষ দেশের বাইরে ভ্রমণ করতে পারেন না। পাসপোর্ট প্রাপ্তি একজন নাগরিকের অধিকার এবং মানুষের জন্য মূল্যবান দলিল কিন্তু তা সংগ্রহে রাখা না রাখা নাগরিকের ইচ্ছাধীন। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে, কিন্তু কোনো নাগরিকের পাসপোর্ট থাকতেই হবে এ মর্মে রাষ্ট্র কাউকে বাধ্য করতে পারে না। একজন মানুষের একই সঙ্গে একাধিক দেশের পাসপোর্টও থাকতে পারে। পাসপোর্ট প্রাপ্তির জন্য মানুষকে নির্ধারিত ফি দিতে হয়। নবায়ন/রি-ইস্যুর জন্যও ফি দিতে হয়। তবে পাসপোর্ট নবায়ন/রি-ইস্যুতে বিলম্বের জন্য জরিমানা ধার্য কতটা সঙ্গত তা আলোচনার দাবি রাখে। আরো মজার ব্যাপার, ডিজিটাল বাংলাদেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাসপোর্টের ওয়েবসাইটে ফিসের কিংবা জরিমানার হার দেওয়া নেই। এটা নাগরিককে অন্য কোনোভাবে জেনে নিতে হয়।
নতুন পাসপোর্ট করতে জরুরি ক্ষেত্রে ৬০০০.০০ টাকা আর সাধারণের ক্ষেত্রে ফি ৩০০০.০০ টাকা। এর উপর ভ্যাট শতকরা ১৫% যোগ করে প্রদেয় যথাক্রমে ৬৯০০.০০ ও ৩৪৫০.০০ টাকা। সরকারি কর্মচারী ব্যতীত প্রতিটি নতুন পাসপোর্টের জন্য পুলিশি তদন্ত করতে হয়। সকল পাসপোর্টের জন্য তথ্যাদি অধিদপ্তরের তথ্যভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। একারণে ধার্যকৃত ফি নিয়ে কারো কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু যখন নবায়ন/রি-ইস্যু করা হয় তখন তথ্যভাণ্ডারে কোনো তথ্য যুক্ত হয় না, কিংবা লাগে না পুলিশি প্রতিবেদন তবে কেন দিতে হবে নতুন পাসপোর্টের সমপরিমাণ ফি?
আমাদের দেশের পাসপোর্টের মেয়াদকাল ৫ বত্সর। প্রকৃত অর্থে এটি সাড়ে চার বত্সর। কেননা পাসপোর্টের মেয়াদ ছয় মাসের কম অবশিষ্ট থাকলে দেশের বাইরে যাওয়া যায় না। সেই অর্থে সাড়ে চার বত্সর মেয়াদী একটি পাসপোর্ট রি-ইস্যু করতে প্রতিবার ৩৪৫০.০০ টাকা আর জরুরি ক্ষেত্রে ৬৯০০.০০ গোনাটা একজন নাগরিকের পক্ষে কষ্টকরই। অনেকের হয়তো পাসপোর্টের মেয়াদকালে একবারের বেশি বিদেশ যাওয়া হয়নি, কিংবা যাওয়া হয়নি মোটেও।
বাংলাদেশ হতে প্রতি বত্সর প্রায় একলাখ ২৭ হাজার লোক হজ পালন করতে যান। এদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ লোকই প্রথমবার পাসপোর্ট করে দেশের বাইরে যান, তেমনি অনেকে পাসপোর্ট করে ওমরাহ পালন করে আসেন এবং আর হয়তো কখনই বিদেশ যান না। হজ ছাড়াও হাজার হাজার তীর্থযাত্রী সারাজীবনে হয়তো একবারই পার্শ্ববর্তী দেশে তীর্থে যান কিংবা যান ডাক্তার দেখাতে। ব্যক্তি পর্যায়ে হয়তো এক পাসপোর্টকালে একবারই এই গমন।
পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর হজে, ওমরাহ, তীর্থে বা ডাক্তার দেখানোর জন্য আর্থিক সঙ্গতি না হওয়ায় বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় বিধায় নবায়ন/রি-ইস্যু করা হয় না পাসপোর্ট। সবারই যে বিদেশে আত্মীয়-স্বজন থাকবে, সেমিনার ওয়ার্কশপে আমন্ত্রণ থাকবে, পর্যটনের আর্থিক সঙ্গতি বা ঝোঁক থাকবে এমন তো কোনো কথা নেই। পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার অনেকদিন পরে আবার হয়তো জেগে ওঠে বাসনা—হজে, ওমরাহ বা তীর্থে যাওয়ার, দেখেন মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে পাসপোর্টের। রি-ইস্যু করতে গেলে নতুন পাসপোর্টর জন্য ধার্যকৃত ফি দেওয়া ছাড়াও দিতে হবে প্রতি বছর বিলম্বের জন্য ৩০০.০০ যোগ ভ্যাট ১৫% জরিমানা। যে কাজ একজন নাগরিক কোনোকালে না করলেও কোনো দণ্ড দিতে হবে না, সেই কাজ একবার করার পর দ্বিতীয়বার করতে বিলম্বের কারণে জরিমানা জুলুম বৈ নয়। প্রথমবারে পণ্য কেনার পরে দ্বিতীয়বার রেয়াত পাওয়ার কথা। সেখানে রি-ইস্যুর জন্য নতুন পাসপোর্টের সমপরিমাণ ফিসের পরিবর্তে রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে ফিস হ্রাস করা হোক। নাগরিক প্রয়োজন মনে করলে অনেক অনেক দিন পরে পুনরায় পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা বোধ করলে তাকে জরিমানার দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া হোক। বড়জোর বিলম্বিত পাসপোর্টের জন্য নতুন পাসপোর্টের রীতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আর সাড়ে চার বছরের মাথায় রি-ইস্যুর ধকল থেকে পাসপোর্ট অধিদপ্তর নিজেকে রক্ষা করতে পাসপোর্টের মেয়াদ এক যুগ মানে ১২ বছর করে দিক। এতে মানুষেরও ভোগান্তি কমবে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরেরও কাজের চাপ কমবে।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
