খুলনায় অধিকাংশ ঘের ভারতীয় বাগদা-গলদা পোনায় সয়লাব!

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৫

ভাইরাস ও জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এনামুল হক, খুলনা অফিস

ভারত থেকে আনা বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনায় সয়লাব হয়ে গেছে ‘মাছের খনি’ বলে খ্যাত খুলনার ঘের অঞ্চল। এসব রেণু পোনা নির্বিচারে ঘেরে ছাড়া হচ্ছে। ফলে চিংড়ি ঘেরে ভাইরাস ও জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারত থেকে আসা পোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন খুলনা অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা। খুলনার ডুমুরিয়া ও পাইকগাছা, বাগেরহাটের ফকিরহাটের ফলতিতা, রামপালের ফয়লা, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলাসহ বিভিন্ন পোনার বাজারে ভারত থেকে চোরাইপথে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে চিংড়ির রেণু  পোনা আসে। সেই চিংড়ি পোনাতেই এখন সয়লাব এলাকা। দেশি হ্যাচারির পোনাও ভারতীয় পোনার কাছে টিকতে পারছে না।

অভিযোগ রয়েছে, বেশ কিছু অসাধু হ্যাচারি মালিক ভারতীয় পোনাকে দেশি নদ-নদীর রেণু পোনা বলে চিংড়ি চাষিদের কাছে বিক্রি করছে। বেশির ভাগ পোনা ঘেরে ছাড়ার পরেই মারা যাচ্ছে। ফলে আবার পোনা ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে যেমন চিংড়ির উত্পাদন খরচ বাড়ছে, তেমনি উত্পাদনও কম হচ্ছে ।

জানা যায়, খুলনার বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় দেশের সবচেয়ে বেশি গলদা ও বাগদা চিংড়ির চাষ হয়। এসব এলাকায় প্রতি বছর কয়েক কোটি রেণু পোনার চাহিদা থাকে। কিন্তু প্রাকৃতিক উত্স যেমন নদ-নদী, খাল-বিল থেকে রেণু পোনা আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় হ্যাচারির রেণু পোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন চাষিরা। চাষিদের সঙ্গে প্রতারণা করে ভারতীয় অপুষ্ট ও গুণগতমানহীন পোনা তুলে দেন অনেক হ্যাচারি মালিক ও অসাধু ব্যবসায়ী।

বাগেরহাট জেলার মোংলার চিলা ইউনিয়নের সুন্দরতলা গ্রামের ঘের মালিক বিজন বৈদ্য বলেন, প্রাকৃতিক উত্স থেকে রেণু পোনা আহরণ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে আসা অপুষ্ট রেণু পোনা দেশি হ্যাচারির বলে চাষিদের কাছে বিক্রি করেন। যা ঘেরে ফেলার পর ভাইরাসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মরে যায়। ফলে কাঙ্ক্ষিত চিংড়ি উত্পাদন থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন মত্স্য চাষিরা।

তিনি জানান, নদী থেকে মাছের পোনা বা রেণু ধরা নিষিদ্ধ। তারপরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও কোস্টগার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী থেকে রেণু আহরণ করেন এ অঞ্চলের নদ-নদী পাড়ের হাজার হাজার সহায়-সম্বলহীন গরিব মানুষ। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় পোনা ধরেই এসব মানুষের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। এসব মাছের পোনা মানে ভালো হলেও ভারতীয় রেণুর কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে।

বিজন বলেন, এ অঞ্চলে দেশীয় বাগদা রেণু পোনা প্রতি হাজার বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬শ’ টাকা। যা গত বছর ছিলো ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। গলদার রেণু পোনা এবার প্রতি হাজার বিক্রি হয়েছে দেড় হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

রামপালের ফয়লা বাজারের চিংড়ির পোনা ব্যবসায়ী কালাম শেখ বলেন, ভারত থেকে অবৈধভাবে বাগদা ও গলদা রেণু এনে পোনা উত্পাদন ও বাজারজাত করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। সাতক্ষীরার সীমান্ত থেকে এসব রেণু এনে ডুমুরিয়া, ফকিরহাটের ফলতিতা, রামপালের ফয়লা, মোংলাসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়। এসব পোনা নিম্নমানের। দামে কম হওয়ায় না বুঝে অনেক চিংড়ি চাষি ঘেরে এ পোনা ছাড়েন।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উত্স থেকে আহরিত রেণুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। এগুলো অনেক দিন বাঁচে, আকারে বড় হয় এবং গুণগত মানও ভালো। ফলে উত্পাদন হয় ভালো। কিন্তু ভারতীয় পোনার গুণগত মান খারাপ হওয়ায় ঘেরে চিংড়ি মারা যায়।

খুলনা জেলা হ্যাচারি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি জি এম ইকরামুল ইসলাম বলেন, ভারত থেকে বাগদা ও গলদার রেণু এনে পোনা উত্পাদন ও বাজারজাত করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এর মধ্যে কিছু হ্যাচারি মালিকও রয়েছেন। এসব পোনা দেখতে খুবই সুন্দর। দামে কম অপুষ্ট ও গুণগত মানহীন এসব পোনা চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার সীমান্ত থেকে ভারতীয় পোনা তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের বালিয়া ব্রিজ ও পাইকগাছার শিববাড়ি ব্রিজ পার হয়ে মাইক্রোবাসে গভীর রাতে খুলনায় প্রবেশ করে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালনকারী চিংড়ি শিল্প। সেকারণেই সরকারকে এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত বলে মনে করছেন ঘের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা।

খুলনা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ বলেন, অবৈধভাবে যারা ভারতীয় চিংড়ি পোনা আনেন তাদের বিরুদ্ধে কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সময় অভিযান চালানো হয়। আটক ও জরিমানা করা হয় তাদের।

খুলনার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম শফিউল্লাহ বলেন, চোরাইপথে যারা ভারত থেকে পোনা আনে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চোরাকারবারীর সঙ্গে জড়িতদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।