জব্বারের বলী খেলা ও ঐতিহ্যের নবায়ন

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৯

আজ চট্টগ্রামে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হইতে যাইতেছে জব্বারের বলী খেলার ১১০তম আসর। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বত্সর ১২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত শতবর্ষী এই আয়োজনটি ইতোমধ্যে আমাদের ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হইয়াছে। আর এই বলী খেলাকে কেন্দ্র করিয়া যেই মেলা বসে— তাহাও দেশের সর্ববৃহত্ লোকজ উত্সব হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। আরও তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, ইহা নিছক উত্সব মাত্র নহে, এই আয়োজনটির জন্মের সহিত জড়াইয়া আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যরকম এক বীজমন্ত্রও। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ১৯০৯ সালে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রাখিয়াই এই বলী খেলা তথা কুস্তি প্রতিযোগিতার সূচনা করিয়াছিলেন। সেই উদ্দেশ্যটি হইল ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ের জন্য দেশের যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম করিয়া তোলা। মনে রাখা আবশ্যক যে, মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে এই চট্টগ্রামেই মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সূচনা হইয়াছিল সর্বভারতীয় যুববিদ্রোহের—যাহা বহিরাগত ব্রিটিশ শাসকদের পায়ের তলার মাটি কাঁপাইয়া দিয়াছিল। আবদুল জব্বারের সেদিনের সেই ক্ষুদ্র প্রয়াস যে বিফলে যায় নাই— তাহার উজ্জ্বলতম উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে শতাধিক বর্ষ পরেও এই বলী খেলা ও লোকজ মেলার গৌরবোজ্জ্বল অধিষ্ঠান।

আবদুল জব্বার সওদাগরের মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতাটি ‘জব্বারের বলী খেলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। শুধু তাহাই নহে, এই বলী খেলাকে কেন্দ্র করিয়া লালদীঘি ময়দানের আশেপাশে প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়িয়া যে বৈশাখী মেলা বসে তাহাতে রকমারি লোকজপণ্যের বিচিত্র সম্ভার লইয়া ছুটিয়া আসেন সারা দেশের কারুশিল্পী, ক্ষুদ্র উত্পাদক ও ব্যবসায়ীরা। তিনদিনের মেলা হইলেও কয়েকদিন ধরিয়া চলে এই মেলা। হাজার হাজার মানুষ সপরিবারে ইহাতে অংশগ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে চলে ব্যাপক কেনাকাটাও। বংশপরম্পরায় চলিয়া আসিতেছে এই ধারা। চট্টগ্রামবাসী অপেক্ষায় থাকেন এই মেলার জন্য। মেলাকে ঘিরিয়া শিশু-কিশোরদেরও আনন্দের সীমা থাকে না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চল হইতেও নামি-দামি বলীরা এই খেলায় অংশ নিতেন। বলী বা কুস্তিগীরের দেশ হিসাবে নামডাক ছিল চট্টগ্রামের। জানা যায়, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে ‘মল্ল’ উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী এই মল্লরা ছিলেন সুঠামদেহী ও সাহসী এবং তাহাদের বংশানুক্রমী পেশা হইতেছে শারীরিক কসরত্ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলী খেলার প্রধান আকর্ষণ। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবার ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। কিন্তু দিন বদলাইয়া গিয়াছে। পেশাদার বলীর অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই বলী খেলার আকর্ষণ হ্রাস পাইতেছে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী তরুণরা নূতন নূতন খেলার দিকে আকৃষ্ট হইতেছে। কিন্তু বলী খেলাকে কেন্দ্র করিয়া যুগ যুগ ধরিয়া যে লোকজ মেলা ও উত্সব বটবৃক্ষের মতো শিকড় বিস্তার করিয়াছে—তাহার আবেদনে একটুও ভাটা পড়ে নাই। বরং দিন দিন তাহা আরো বিস্তৃত হইতেছে। নবায়ন হইতেছে ঐতিহ্যের। ইহাই প্রগতি বা অগ্রযাত্রার ধর্ম। আবহমান বাংলা ও বাঙালির চিরায়ত এই ধর্মকে শিরোধার্য করিয়া জব্বারের বলী খেলা আরো শতবর্ষ বাঁচিয়া থাকুক—ইহাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।