উপমহাদেশে সন্ত্রাসবাদের শঙ্কা ও নিরাপত্তা

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৭

ফাইজুল ইসলাম

নাইন-ইলেভেনের পর পৃথিবী সত্যি বদলে গেছে। বিশ্বে আজ নিরাপত্তা ইস্যুই প্রধান হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার দিক দিয়ে আমরা কমবেশি সকলেই শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। উন্নয়নশীল দেশ থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্ব সবখানেই বিরাজমান উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা। যারা অন্যের ঘরে আগুন লাগাতে গিয়েছিলেন, সেই আগুনের লেলিহান শিখার উত্তাপ আজ তারাও আঁঁচ করছেন। বলতে গেলে কেউই আজ শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগ নাইন-ইলেভেন উত্তর বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের একটি চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে সন্নিবেশিত হয়েছে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর শুধু ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে যুদ্ধ ও নানা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে চার লাখ ৮০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ সাত হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আর ২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়া যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। লিবিয়া ও ইয়েমেনসহ অন্যান্য যুদ্ধের পরিণামের কথা এখানে নাই-বা তুলে ধরা হলো। অথচ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পর ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারীসহ নিহত হন ২,৯৯৬ জন।

গত ২১ এপ্রিল সোমবার শ্রীলঙ্কার কয়েকটি চার্চ ও হোটেলে স্মরণকালের যে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হলো তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন হামলার পর বিশ্বের সবচাইতে ভয়াবহ হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এই হামলায় নিহত হয়েছেন ৩৫৯ জন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, নিহতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশটিতে এখনো শোকের মাতম চলছে। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে কফিন ছুঁয়ে চোখের জলে অনেকে গতকাল প্রিয় মানুষদের বিদায় জানিয়েছেন। বিশ্বনেতারা এর নিন্দা-ক্ষোভ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন। একই সঙ্গে দেশটিতে এখনো বিরাজ করছে জরুরি অবস্থা।

শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার পর দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এই ব্যাপারে সতর্ক করলেও এই হামলা প্রতিহত করতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কা সরকারকে সতর্ক করেছিল। এমনকি সম্ভাব্য হামলাকারী কারা হতে পারে তাও বলা হয়েছিল। নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছিল, ন্যাশনাল তৌহিদ জামাতের (এনটিজে) নামও। কিন্তু শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা এখন বলছেন, তাকে এই আগাম সতর্কবার্তা জানানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহ বলছেন, এই হামলায় আইএসের স্বীকারোক্তিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। এর আগে তিনি বলেন যে, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজ আদায়কালে মুসলিমদের ওপর হামলার প্রতিশোধ নিতেই শ্রীলঙ্কায় হামলা হয়েছে।

গতকাল বিবিসি লঙ্কান উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুয়ান উইযেওয়াদেনের বরাত দিয়ে বলেছে যে, শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডেতে হামলাকারীদের বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত ও ধনী পরিবারের সন্তান। এই পর্যন্ত ৯ হামলাকারীকে চিহ্নিত করেছে দেশটি। দায় স্বীকারের পর যাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে আইএসের বার্তা সংস্থা আমাক-এ। বলা হচ্ছে, আত্মঘাতী হামলাকারীদের একজন যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে সে শ্রীলঙ্কায় বসবাস শুরু করে। তাকেই মূল হামলাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার নাম জাহরান হাশিম।

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত নিরাপত্তাগত নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যদিও আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ব্যাপারে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামের বক্তব্যেও একই সুর পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ঝিমিয়ে পড়া উগ্রবাদীদের উসকে দেওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে এরা কিছু করতে পারবে না। ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা বলেন। তার মতে, হলি আর্টিজান হামলার পর সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে জঙ্গিবাদ এখন নিয়ন্ত্রণে। জঙ্গিদের অনেকে নির্মূল হয়েছে বা আইনের আওতায় এসেছে। বাকিরা আছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে। তবে তিনি এই কথাও বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি না রাখা হলে এবং তাদের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদি হলে ভবিষ্যতে তারা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। এখানে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কেননা স্বল্প পরিচিত উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়ে যে নৃশংসতম ও হূদয়বিদারক হামলার ঘটনা ঘটানো যায় শ্রীলঙ্কায় হামলার ঘটনা তারই প্রমাণবহ।

ইতোমধ্যে তিন দিনের ব্রুনাই সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলা চলছে। তাই আমাদের সতর্ক হতে হবে। তিনি বিমানবন্দর থেকে গণভবনে পৌঁছেই সর্বস্তরের দলীয় নেতা-কর্মীদের এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করি, একই নির্দেশ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মেনে চলবেন। সমপ্রতি মার্কিন দূতাবাস থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ভিড় পরিহার করার জন্য বলা হচ্ছে। সুতরাং এদেশেও যে উদ্বেগ বিরাজ করছে না, তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শ্রীলঙ্কায় হামলার ঘটনায় মারা গেছেন প্রধানমন্ত্রীর ফুপাতো ভাই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জাতীয় সংসদের এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের আদরের নাতি জায়ান চৌধুরী (৮)। তার জামাতা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও আহত হন এবং ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। তারা শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে গিয়ে একটি হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। এজন্য শ্রীলঙ্কার শোকের ছায়া বাংলাদেশেও এসে ভর করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রুনাই সফর শেষে যখন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন শোকাহত শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে তিনি সান্ত্বনা দেন। এইসময় তিনি নিজেও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। জায়ান চৌধুরীর লাশ গতকালই বাংলাদেশে এসে পৌঁছে। তাকে শেষ বিদায় জানাতে এসেও কান্নায় ভেঙে পড়েন নানী শেখ হাসিনা। জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে বনানী কবরস্থানে।

শ্রীলঙ্কায় হামলার ঘটনা এমন সময় হয়েছে, যখন দেশটিতে কয়েকমাস আগেও চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল। প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা কথা নেই বার্তা নেই হঠাত্ প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে বসেন এবং তদস্থলে বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। আদালত একে অবৈধ বলে রায় দেয় এবং রনিল বিক্রমাসিংহ তার প্রধানমন্ত্রীর পদ ফিরে পান। এ নিয়ে যে নাটক চলে, তা উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি অসুস্থ দৃষ্টান্তই তৈরি করে। মালদ্বিপের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও আমরা একই রকম খেলা খেলতে দেখেছি। উপমহাদেশ যে ক্রমেই পশ্চিমা বিশ্ব বনাম একটি উঠতি বৃহত্ শক্তির দ্বন্দ্বের লীলাভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।

অতএব, শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার ঘটনা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো—একটি দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতন্ত্রহীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অভাব, মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদির কারণে গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করে, তখন সেই দেশে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের মাথা চাড়া দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী শক্তি ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক সেই সুযোগেরই অপেক্ষা করে। এই ব্যাপারে আমরা সতর্ক না হলে ভারতীয় উপমহাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ থেকে কখনো মুক্তি পাবে না।

n লেখক : সাংবাদিক