আবদুজ জাহের নিশাদ
বিধাতার অপার করুণায় এই ভুবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো কিছুই আজ আমাদের অজানা নয়। সীমাহীন পৃথিবীর প্রেমময়ী রহস্য উদঘাটন করতে ক্ষণস্থায়ী ধরার কেউবা চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য কাল্পনিক প্রচেষ্টাও চালায়। যদিও সবাই স্রষ্টার কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময় নিয়েই এসেছে। তবে ধরার এই সৌন্দর্য ব্যক্তির জন্য ক্ষণস্থায়ী জানা সত্ত্বেও এই ভুবনে মানুষ চিরস্থায়ী হতে চাই। তবে মাঝে মাঝে কালশ্রয়ী সমাজের কিছু মানুষ ধরার অফুরন্ত শ্রী-কে তুচ্ছ ভেবে স্বেচ্ছায় নরকের আশীর্বাদ পেতে চাই। ঠিক যে মানুষটা মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও পৃথিবীর নান্দনিক শ্রী-কে চিরস্থায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছে তার এক মুহূর্ত পরেই জীবনের সকল স্বপ্ন নিপতিত করে পাড়ি জমালেন নারকীয় অনন্তকালে। আর এটা সম্ভব হয় শুধু খেয়ালের ভুলেই। ঠিক এ মুহূর্তে মনে পড়ে আমাদের আদি মা-বাবার কথা। তারা যদি সামান্য ভুলটি না করতেন তাহলে হয়ত দৈনন্দিন জীবনের অজস্র ভুলের সম্মুখীন হওয়া থেকে রেহাই পেতেন। আর রেহাই না পাওয়াই আজ বলতে হয় মানুষ মাত্রই ভুল। আবার পৃথিবীতে এমন কোনো ভুল নেই যে, যার কোনো সমাধান নেই। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য আর সমাধানের চেষ্টা করা। ধৈর্য আর সমাধানের চেষ্টা না করাটাই হচ্ছে কাপুরুষতার পরিচয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে আট লাখের অধিক মানুষ আত্মহত্যা করে নিজের জীবনকে শেষ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। যেখানে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার জন্য যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে তাহলো—ফাঁসিতে ঝোলা, বিভিন্ন ওষুধ বা কীটনাশক সেবন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, অতিরিক্ত মাদক সেবন ও ট্রেন চাপা দিয়ে মারা যাওয়া ইত্যাদি। সারাবিশ্বে এই প্রবণতা একইরকম। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। এর অনেক কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো—বেকারত্ব বাড়া, পারিবারিক অশান্তি, বিভিন্ন হতাশা বা টেনশন, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক অস্বীকৃতি,সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়া,অপমান ও অভিমান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা আর অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। কিছুদিন আগে তারই প্রকৃত উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৌমিক মিত্র সবুজের আত্মহত্যা। সমাজের প্রতিটা মানুষ ভুল করে। হোক সে শিক্ষক অথবা ছাত্র। ভুল অনুযায়ী বিবেচনা করা হয় তার অপরাধটা কেমন। দেশে প্রতিটি অপরাধেরই শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু কোনো আইনেই লেখা নেই যে আত্মহত্যাই একমাত্র সমাধান। আত্মহত্যা যেমনি সামাজিক ব্যাধি তেমনি ধর্মীয় দিক দিয়েও এটি নিকৃষ্ট কাজ। পৃথিবীর কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না বরং আত্মহত্যাকারীর জন্য লাঞ্ছনা আর বঞ্চনার কথা উল্লেখ রয়েছে। আমরা বলতে পারি যে, সৌমিক মিত্রের মিডটার্মের ফলাফল মোটেও কাম্য নয়। কাম্য না হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষায় বিভাগের প্রথম স্থান অধিকার করে সেখানে এটা কিভাবে কাম্য সে প্রশ্ন থেকেই যায়। যেখানে তৃতীয় সেমিস্টারে একটি কোর্সে ১৫ এর ১২ অপর কোর্সে ১৫ এর ৫ পেয়েছেন। যা কখনো মেনে নেওয়ার মতো না। যে ছাত্রটি প্রথম, দ্বিতীয় সেমিস্টারে বিভাগের প্রথম হয় কিন্তু তৃতীয় সেমিস্টার মিডটার্মে এসে শুধুমাত্র হাতের লেখা খারাপের কারণে সে সবার পিছনে যাবে—আমার মতে এটা অসচেতনতা আর গাফিলতির ফলাফল ছাড়া কিছুই নয়। তবে হ্যাঁ যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির সঠিক তদারকির জন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়েছেন। সেহেতু আর কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করলে হয়তো ঢাবির গর্বিত শিক্ষক হওয়া শুধু স্বপ্নে নয় বাস্তবে রূপ দিতে পারতো সৌমিক। আপনি জানেন যে, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়; তদুপরি নিজের জীবনকে ধ্বংস করেছেন শুধু মানসিক যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে। কারণ যারা আত্মহত্যা করে তারা মারা যেতে চায় না, তারা চায় জীবন-যাপন বন্ধ করতে। যদি এমন পথ থাকতো যে জীবন-যাপন করতে হবে না এবং মৃত্যুও হবে না। তাহলে তারা সে পথকেই বেছে নিতো। জাতির ঊষার কর্ণধার আমাদের সচেতন শিক্ষক সমাজ যদি আরেকটু সচেতন হতেন তাহলে হয়তো আজ আমরা সৌমিকের মতো জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবীকে হারাতাম না।
আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরো আন্তরিক ও সচেতনভাবে কাউন্সেলিং করতে হবে। সমাজে আত্মহত্যার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজকে দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষক সমাজকে পালন করতে হবে তার পেশাদারিত্ব। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির প্রতি বিশেষ সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করতে হবে। তাহলেই হয়ত সৌমিকের মতো মানুষগুলো আলোর পথ দেখবে অকালে ছেড়ে যাবে না প্রেমময়ী পৃথিবী।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
