ঢাকের তালে জীবন এখন অচল

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:০৯
একজনের কাঁদে ঢাক, অন্যজনের গলায় ঢোল, অপরজনের হাতে ঝুমুর। তিনটি বাদ্যযন্ত্রই একসঙ্গে বেজে দর্শনার্থীদের মনে দেয় দোলা। বাজনার তালে তালে তারা তিনজনও যেন বেজে চলেছেন আর নাচছেন। সেই তালেই মেতে উঠেছেন চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীরও। হেলে-দুলে, নেচে-গেয়ে, তারাও বিষয়টা উপভোগ করেছেন। 
 
গত বৃহস্পতিবার পূজার নবমীর রাতে ঢাক-ঢোলের এই বাজনার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ধরা পড়লো গৌরীপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার দুর্গাপূজা মণ্ডপে। শারদীয় দুর্গোৎসবে একটি প্রয়োজনীয় জিনিষ ঢাক-ঢোল। তাইতো পূজা মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ পূজাকে কেন্দ্র করে ঢাক-ঢোলের এই বাজনার আয়োজন করে। আর ঢাক-ঢোল বাজাতে এসেছেন ঢাকি বাচ্চু মিয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল। 
 
ঢাকিদলের প্রধান বাচ্চু মিয়া এ প্রতিনিধিকে জানান, তার বাড়ি গৌরীপুর পৌর শহরের বাদ্যকর পাড়ায়। তার বাবার নাম মৃত তৈয়ব আলী পাগলা। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার বাবা গৌরীপুরের জমিদার বাড়ির গান-বাজনার আসরে বাদ্য যন্ত্র ও বাঁশি বাজাতেন। ছোট বেলায় বাচ্চু ও তার বাকি তিন ভাই বাবার কাছ থেকেই এইসব বিষয়ে তালিম নেয়। দুই যুগ আগে তার বাবার এবং ৫/৬ বছর পূর্বে বড়ভাই পাচু মিয়ার মৃত্যুর হলেও বাচ্চু ও খলিল এখনো বাবার পেশাটাকে আকরে ধরেই বেঁচে আছেন। 
 
বাচ্চুর স্ত্রী  ফিরোজা বেগম একজন গৃহিণী। সংসারে তাদের আরিফ ও আরমান নামে দুই ছেলে রয়েছে। এই দুই ছেলেও বাচ্চুর সঙ্গে সঙ্গে থেকে এই পেশায় যুক্ত হয়েছে। চলতি দুর্গোৎসবে পৌর শহরের মধ্যবাজার পূজা মণ্ডপে ১৮ হাজার টাকায় তিন সদস্যের দল নিয়ে ঢাক বাজানোর কাজ নিয়েছেন বাচ্চু। এই দলে রয়েছে তার ছেলে আরিফ ও তার সহযোগী মোস্তাকিম।
 
কথা বলতে বলতে বাচ্চু জানান, দুর্গাপূজার ছুটিতে যখন মানুষ কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরেন। তখনই ঢাক বাজানোর জন্য ঘর ছাড়তে হয় ঢাকিদের। বায়নার দিন থেকে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে ঢাক বাজায় ঢাকিরা। সারা বছর ছোটখাটো পূজা ও বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢাক বাজালেও বড় রোজগারটুকু এই দুর্গোৎসবের সময়ই হয়। 
 
পরক্ষণেই আক্ষেপ নিয়ে বাচ্চু বলেন, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম আসার কারণে এখন আর ঢাকিদের আগের মতো কদর নেই। শুধু হিন্দু ধর্মের পূজা, বিয়ে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই নিয়ম রক্ষার খাতিরে ঢাক-ঢোল বাজানো হয়। বলতে গেলে বিলুপ্ত প্রায় এই পেশাটা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই তাদের রীতিনীতির কারণে বাঁচিয়ে রেখেছে। 
 
এরই মধ্যে সময় বেড়ে চলেছে। ঘড়ির কাটায় বেজে উঠেছে রাতা ১১টা। মণ্ডপে কমেছে দর্শনার্থী। আড্ডায় এসে যোগ হয় দলের অপর দুই সদস্য আরিফ ও মোস্তাকিম। আরিফ বলেন, ঢাক- ঢোল বাজিয়ে আমাদের জীবন চলে।  কোনো মাসে ৪/৫ টা কাজ পাই। তখন সংসার ভালো চলে। আবার কোনো মাসে কাজই পাই না, তখন খুব কষ্ট করতে হয়।
 
দলের অপর সদস্য মোস্তাকিম বলেন, দিন দিন ঢাকের বাজনার কদর কমে যাচ্ছে। এখন কেবলমাত্র পূজার অনুষঙ্গ হিসেবে ঢাক টিকে রয়েছে। আর আমাদের তো কেউ শিল্পী বলে মনেই করে না। তবে প্রতিদিন কাজ না থাকায় পেটের দায়ে অন্য কাজ করতে হয় সারা বছর।
 
এদিকে একযুগ আগেও বাদ্যকর পাড়ার অর্ধশতাধিক পরিবার ঢাক-ঢোল ও বাদ্য-যন্ত্র বাজানোর পেশায় জড়িত ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন দুই ভাই বাচ্চু ও খলিলের পরিবারই এখন পেশাটাকে এই অঞ্চলে বাঁচিয়ে রেখেছে। এরমধ্যে বিকল্প আয়ের জন্য বাচ্চু তার দুই ছেলেকে নিয়ে এক ব্যান্ড পার্টি করেছে। স্থানীয় বিভিন্ন পূজা, বিয়ে, সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠান, গানের আসর, যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যান্ড পার্টি বাজায় তারা। সরকারি- বেসরকারি অনুষ্ঠানে বাজিয়ে ১ হাজার থেকে ১৫শ’ টাকা পায়। তবে হিন্দু বিয়ে হলে ৫ থেকে ৮ হাজার পায় তারা।
 
ঢাকি বাচ্চু মিয়া বলেন, ছোট বেলা থেকেই ঢাক-ঢোল নিয়ে আছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। ঢাক বাজলেই আমরা বাঁচি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজায় ঢাক বাজাই। ঢাকের বাজনায় সবাই মেতে ওঠেন। কিন্তু আমাদের কথা ভাবে কে?
 
তিনি আরো বলেন, আমরা ঢাকের বাজনার প্রসার চাই। আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী তো অনেক বিলুপ্তপ্রায় পেশার দুঃস্থ শিল্পীদের সাহায্য করেছেন। আমাদের কি করবেন না?
 
ইত্তেফাক/জেডএইচ