জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিন পার্বত্য জেলায় রক্তের হোলি খেলা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে গত ১০ মাসে ওই এলাকায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। জেএসএস, ইউপিডিএফসহ বিভিন্ন সংগঠন স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের আন্দোলনের আড়ালে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি করে পাহাড়ের জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলা হচ্ছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের অজুহাতে পুনর্বাসিত বাঙালিদের জন্য বরাদ্দ জমি ও পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্প দখল করা হচ্ছে। নিজেরা নানা ধরনের অপকর্ম করে তার দায় নিরীহ বাঙালি ও সেনাবাহিনীর ওপর চাপাচ্ছে। অতি সম্প্রতি কৃত্তিকা ত্রিপুরা ও ইতি চাকমা হত্যাকাণ্ড এর বড় প্রমাণ। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডে ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ইউপিডিএফ’র কর্মকাণ্ড সমর্থন না করলে বাঙালির পাশাপাশি অনেক পাহাড়িকে গুম, খুনসহ চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। মূলত জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেই পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা হতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালের শুরু থেকে গত ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাসে শুধুমাত্র খাগড়াছড়ি জেলায় খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের ৮৩টি অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ৪৬টি ও চলতি বছর এ পর্যন্ত ৩৭টি অপরাধ সংঘটিত হয়। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ মূলত এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংগঠিত অধিকাংশ অপরাধের মাস্টারমাইন্ড ইউপিডিএফ। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া, পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছে। অতি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাত্ ও দলীয় কর্মীদেরকে গুম, খুনের অভিযোগ এনে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে একটি নতুন দল গঠন করেছে দলটির কিছু বিদ্রোহী নেতাকর্মী। বিভক্তির পর থেকেই উভয় গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ হয়ে আসছে যা এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ মে ইউপিডিএফ (মূল) কর্তৃক প্রতিপক্ষ জেএসএস (সংস্কার) এর অন্যতম নেতা এবং নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরের দিন তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাওয়ার সময় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমাসহ ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
ঘটনা দু’টির পর থেকে দলগুলো পরস্পরের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ (মূল) দলের সন্ত্রাসীরা মক্কোশিং মারমা কারবারী নামে এক উপজাতীয়কে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তিনি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তার মুক্তিপণের জন্য ৪ লক্ষ টাকা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। তার পরিবার কোনোমতে সাড়ে তিন লাখ টাকা সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিলেও মক্কোশিং মারমাকে এখনও তারা ছেড়ে দেয়নি।
পার্বত্য খাগড়াছড়ির উপজাতীয় অধিবাসীরা জানান, ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা স্থানীয় পাহাড়িদের নানারকম ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ও গুজব ছড়াচ্ছে। তারা সাধারণ পাহাড়িদের বোঝাচ্ছে যে অতি শীঘ্রই পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের ওপর বড় ধরনের সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তাদেরকে চিরতরে বিদায় করা হবে। এজন্য সাধারণ পাহাড়িদেরকে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে প্রস্তুত থাকতে বলা হচ্ছে যাতে সেই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে তারা আশ্রয় নিতে পারে। ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের এ ধরনের হুমকিতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
