বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মোমের মূর্তির সংগ্রহশালা হিসেবে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ মাদাম তুসো জাদুঘর। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শহরে অবস্থিত এ জাদুঘরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে লন্ডনের পর্যটন শিল্প ও অর্থনীতিতেও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রধান নগরগুলোতে রয়েছে মাদাম তুসো জাদুঘরের শাখা। কিন্তু আজকের মাদাম তুসো জাদুঘরের যাত্রার পথটা এতোটা মসৃণ ছিল না। ১৮৩১ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বেকার স্ট্রিট বাজারের উপরের তলায় ভাড়া থাকতে শুরু করেছিলেন মাদাম তুসো জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা মাদাম ম্যারি তুসো। এর চার বছর পর ১৮৩৫ সালে লন্ডনের এই বেকার স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠা করেন মোমের তৈরি মূর্তি নিয়ে এক বিস্ময় জগত্। এ জগতে শুধু মোম দিয়ে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র তারকা, তারকা খেলোয়াড় থেকে শুরু করে জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে।
ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে জন্ম নেয়া ম্যারি তুসো কিশোর বয়সেই চিকিত্সক ফিলিপ কার্টিয়াসের থেকে মোমের ভাস্কর্য তৈরির হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। ১৭৭৭ সালে তুসো প্রথম মোমের ভাস্কর্য তৈরি করতে বেছে নিয়েছিলেন ভলতেয়ারকে। ঐ সময়ের অন্যান্য জনপ্রিয় ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব জঁ জাক রুশো এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ভাস্কর্যও তৈরি করেন মাদাম তুসো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ও তিনি তার শিল্পকর্ম দিয়ে আন্দোলনের অংশে পরিণত হন। অনেক ঘটনার চিত্রকর্ম মূর্তি হিসেবে তৈরি করার পাশাপাশি অনেক মৃতদেহের মস্তক খুঁজে বের করে তার মুখোশ তৈরি করতেন মোম দিয়ে। এ মোমের মুখোশগুলো আন্দোলনকারীরা তাদের শোভাযাত্রায় ব্যবহার করতো।
১৭৯৪ সালে ডা. ফিলিপ কার্টিয়াস মৃত্যুর আগে তিনি তার যাবতীয় মোমের মূর্তিগুলো তুসোকে দান করে দিয়ে যান। মারি তুসো ঐ মূর্তিগুলোর মালিক হয়ে প্রদর্শনীর জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ শুরু করেন। মোমের মূর্তিগুলোর প্রদর্শনীর জন্য তিনি এসব দেশে কাটিয়ে দিয়েছেন ৩৩ বছর। ১৮০২ সালে মূর্তি শিল্পের অগ্রদূত পল ফিলিডোরের আমন্ত্রণে লন্ডনে গিয়েছিলেন ম্যারি তুসো। মূলত আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন। এই সময়ে তার সাথে ছিল চার বছরের সন্তান জোসেফ। সেখানে লিশিয়াম থিয়েটারে তার মোমের মূর্তিগুলোর প্রদর্শনী হয়। কিন্তু প্রদর্শনী থেকে যে আয় হয়েছিল তার সামান্যই তিনি পেয়েছিলেন।
ঐ সময়েই নেপোলিয়নের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল চরম আর্থিক সঙ্কটের কারণে তখন ফ্রান্সেও ফিরতে পারছিলেন না। গ্রেট ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডে ঘুরতে থাকেন মোমের সংগ্রহশালা নিয়ে।
এক পর্যায়ে লন্ডনের এই বেকার স্ট্রিটে মোমের যাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর তার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই সময়ে মায়ের সাথে কাজ করতে শুরু করে তার বড় ছেলে। তবে তার সেই খ্যাতি চূড়ান্ত অবস্থা লাভ করে যখন তরুণ রানী ভিক্টোরিয়া তার কাজের প্রশংসা করেন। ধীরে ধীরে তার সেই মোমের মূর্তিগুলোর আরো কিছু কপি তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় শাখা চালু হয়। বর্তমানে মাদাম তুসো যাদুঘরের ২৪ শাখা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।-ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
ইত্তেফাক/আরকেজি
