ভূমিকা ও অনুবাদ :আন্দালিব রাশদী
আমি খুব ভাগ্যবান, একজন চমত্কার শিক্ষক পেয়েছিলাম, তিনি আমাকে ওয়ালেস স্টেভেনস-এর কবিতার দিকে ঝুঁকিয়ে দেন। প্রাইমারিতে কবিতা পড়িনি। কিন্তু তার আগে মা আমাকে কবিতা পড়ে শোনাতেন। আমার মা প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। খুব ছোটবেলায় আমাকে এডগার অ্যালান পোর কবিতা শুনিয়েছেন, আমি খুব মোহিত হয়েছি; কার্ল স্যান্ডবার্গের কবিতাও। আমার সুইডিশ বংশোদ্ভূত নানা ঘুম থেকে উঠেই ঊনবিংশ শতকের প্রিয় কবিতাগুলো আবৃত্তি শুরু করতেন—বর্ণনামূলক, নাটকীয় স্বগতোক্তিমূলক—কাজেই আমার পরিবারের মাধ্যমেই খুব ছোটবেলা থেকেই কবিতা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল
‘আমি নিজেকে কবি বলি না, বলি লেখক।’
কবিতায় পুরস্কার পেলেন ফরেস্ট গ্যান্ডার। ২০১২ সালেও তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘কার স্যাম্পলস ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড’ পুলিত্জার পুরস্কার দৌড়ে ফাইনালিস্ট ছিলেন, সে বছর পুরস্কার পেয়েছেন ট্র্যাসি কে স্মিথ।
ফরেস্ট গ্যান্ডারের জন্ম ১৯৫৬ সালে মোহেইভ মরুভূমিতে; যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, ইউটা এবং আরিজোনা অঙ্গরাজ্যের অংশজুড়ে এই মরুভূমি। তাঁর জন্ম ক্যালিফোর্নিয়া অংশে। জন্মসূত্রে তাঁর নাম জেমস ফরেস্ট ককারাইল থ্রি। স্বামীপরিত্যক্ত স্কুলশিক্ষয়িত্রী মায়ের সঙ্গে ফরেস্ট ও দুই বোন ক্যারিন ও লিমা বেড়ে ওঠেন ভার্জিনিয়াতে। তাঁর মা রুথ ক্লেয়ার পরে ওয়াস্টার গ্যান্ডারকে বিয়ে করলে তিনি সন্তানদের পালক হিসেবে গ্রহণ করেন। ফরেস্টের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় গ্যান্ডার। মেধাবী ছাত্র ফরেস্ট শিক্ষাজীবনের প্রায় পুরোটাই বৃত্তিপ্রাপ্ত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। এখন ব্রাউন ইউনিভার্সিটির শিল্পকলা ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক। তাঁর স্ত্রী সিডি রাইট একজন পরিচিত কবি।
গীতিধর্মী কবিতা লেখেন, কিন্তু তাঁর ছন্দ ও গঠন জটিল মনে করা হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাশ টু লেইক’ ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত। কাব্যগ্রন্থ ১০টি, তাঁকে পুলিত্জার এনে দিয়েছে ২০১৮ তে প্রকাশিত ‘বি উইথ’। দুটি উপন্যাস রচনা করেছেন। এক ডজন ফরাসি ও স্পেনিস কাব্যগ্রন্থ তাঁর হাতে অনূদিত হয়েছে। তিনি নিজেও বহুল অনূদিত কবি।
নিজের লেখালেখি নিয়ে ফরেস্ট গ্যান্ডার
‘আমি মনে করি পৃথিবীতে অস্তিত্ববান হয়ে ওঠার প্রকাশের একটি ধরনই কবিতা।
পৃথিবীর সঙ্গে এই যে বিজড়ন তার জটিলতাগুলো যে সব কবিতায় উঠে আসে, সেগুলোই আমার পছন্দের কবিতা। একটি পৃথক ধারা হিসেবে কবিতাকে ভাবতে আমি ক্রমাগত কম আগ্রহী হয়ে উঠেছি। আমি বরং নিজেকে কবির বদলে লেখকই বলতে চাই।’
ফরেস্ট গ্যান্ডার জানেন, পৃথিবীতে কেউ কেউ কবি হওয়াটাকে বেছে নিয়েছেন। এরকম মানুষের সান্নিধ্যে তিনি নিজেকে কবি বলতে রাজি। কিন্তু তিনি এটাও জানেন, এই পরিচয় কোনো কোনো সঙ্গ খুব বিরক্তিকর মনে করবে, তাদের কাছে এই পরিচয়ের বাস্তব মূল্য নেই।
‘আমার আগ্রহ বিভিন্ন শাখায়। আমি প্রবন্ধ লিখি। আমি উপন্যাস লিখি, অনুবাদ করি। সব ধরনের লেখাতেই আমার আগ্রহ তবে লেখালেখির আমি যা কিছু শিখেছি সবই এসেছে কবিতা থেকে।’
তাকে কি স্কুলে কবিতা শেখানো হয়েছে?
তিনি বললেন, হাইস্কুলের আগে আমি কবিতা পড়েছি বলে মনে পড়ে না। আমি খুব ভাগ্যবান, একজন চমত্কার শিক্ষক পেয়েছিলাম, তিনি আমাকে ওয়ালেস স্টেভেনস-এর কবিতার দিকে ঝুঁকিয়ে দেন। প্রাইমারিতে কবিতা পড়িনি। কিন্তু তার আগে মা আমাকে কবিতা পড়ে শোনাতেন। আমার মা প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। খুব ছোটবেলায় আমাকে এডগার অ্যালান পোর কবিতা শুনিয়েছেন, আমি খুব মোহিত হয়েছি; কার্ল স্যান্ডবার্গের কবিতাও। আমার সুইডিশ বংশোদ্ভূত নানা ঘুম থেকে উঠেই ঊনবিংশ শতকের প্রিয় কবিতাগুলো আবৃত্তি শুরু করতেন—বর্ণনামূলক, নাটকীয় স্বগতোক্তিমূলক—কাজেই আমার পরিবারের মাধ্যমেই খুব ছোটবেলা থেকেই কবিতা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
আমি হাইস্কুলে ওঠার আগে থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সমকালীন কবিতা তখনো পড়িনি। কার্ল স্যান্ডবার্গ, ওয়ালেস স্টেভেনস-এর সমসাময়িক হলেও স্যান্ডবার্গ ভিন্নধারার। স্যান্ডবার্গের কবিতা ঊনবিংশ শতকেও চালানো যেত, কিন্তু ওয়ালেস স্টেভেনের কবিতা নয়।
প্রকাশের আগে ফরেস্ট গ্যান্ডার তাঁর কবিতা অন্যদের দেখান না, তার কারণ অন্যের সময় ও পরিসরের মূল্য আছে। তাকে এ বোঝা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। তবে তাকে অনেক পাণ্ডুলিপি পাঠ করতে হয় সম্পাদক হিসেবে।
তিনি স্বীকার করেন, পেশাগতভাবে অন্যের পাণ্ডুলিপি পাঠের সময় তিনি যতটা বস্তুনিষ্ঠ থাকেন, নিজের পাণ্ডুলিপি পাঠের সময় তা হয়ে ওঠে না।
তিনি পুরনো দিনের লেখা পড়েন। তিনি স্যাফোর কবিতার অনুবাদ করছেন, দু হাজার বছর আগেকার ল্যাটিন কবি গাইয়ুম ভ্যালেরিয়াস ক্যাতুল্লাস পড়াচ্ছেন। তিনি এক ক্লাসে প্রাচীন গ্রিক কবিতা পড়ান তো অন্য ক্লাসে পড়ান ঊনবিংশ শতকের হার্ডি, হপকিন্স। উপন্যাসের বেলাতেও তা-ই। তিনি ২৪ ঘণ্টা ধরে হার্ডি আবৃত্তি করে যেতে পারেন। অডেনের প্রথম দিককার কবিতা পছন্দ করেন, শেষের দিকেরগুলো নয়।
লিখতে গেলে অনুপ্রাণিত হবার জন্য অপেক্ষা করা একটি ‘বাজে অ্যাপ্রোচ’ কাজেই লিখতে হলে পেশাজীবীর মতোই কাজটা করতে হবে।
কমলালেবু ঠাণ্ডায় জমে যায়
উত্তর দিকে কমলা পাকার চিহ্ন ধরে
আবর্জনার ঘন নিঃশ্বাস আগুন ধরায়
ধোঁয়া উঠতে থাকে সারারাত; ছলকে
বেরিয়ে আসা জিন জমে যাওয়া গাছ ভালোবাসে
কিন্তু রক্ষা করতে পারে না।
আঁশছড়ানো মাকড়শার মতো তুষার।
কোনো খবর—কিছুই নেই
সৈকতে বড় ইঁদুর বাচ্চা বিয়োয়
ছোট ইঁদুর এদিকে তাড়ায়
আজ দু দিকেই পাতা আছে ফাঁদ।
পায়চারি
কক্ষ ছেড়ে যাবার সময়টা আমি জানব
যেখানে আমার মুখমণ্ডলে গজিয়েছে
চুল, কড়া বিয়ার পান করতে করতে
যখন লেকের আলো মলিন হয়ে আসে।
তখন শুরু হয়
মাছেদের গান
নীল স্রোতে শুয়ে
চন্দ্রবিদায়ের
অপেক্ষা করে
লণ্ঠন হাতে জেলেরা তা জানে
কচি ভুট্টার কৌটা খুলে
দানা ছড়াতে ছড়াতে ভাবে
তারা কি বলছে, যা তারা মাত্র ভেবেছে।
আমি কুয়াশার মধ্য দিয়ে পথ কাটি
সংগীত যেমন ভাঙে স্থিরতা
ব্যাঙেরা লাফায়
বৃদ্ধনিবাসের একটি জানলা মিলিয়ে যায়
তোমার কি অবাক লাগে না
যে কোনো স্থান থেকে কেন এত দূরে নির্মিত
যেন বিস্মৃত হতে স্মৃতি চায় ভূখণ্ড, হারানো
পথের যেমন অন্ধগলি
আমার বাবা ও মায়ের কথা—তারা
বৃদ্ধ হননি—আমি জানি
কথোপকথন বিহীন নৈশভোজ
যে কারোর জন্য জ্বলে নক্ষত্র
আমি জানি, আমার সময় সংক্ষিপ্ত,
সমকালের ভালোবাসার কথা আমি জানি।
আমি বলতে চাই
সেইসব পুরুষের জন্য দুঃখবোধ করো না
যারা নারীদের ছেড়ে যায়
সিগারেটের মতো ধিকিধিকি জ্বলে
শেষকৃত্য পছন্দ যাদের
যুদ্ধ মনের একটি অভ্যাস
আমার মায়ের লিঙ্গের যারা তাদের শপথ।
(আংশিক)
সি-এর প্রতি
ভেতরে, প্রত্যাবর্তনের ভেতরে, ভেতরে নায়ক বিলীন হয়ে যায়।
তার পাত্রের ওপর তারা আবরণ টানে, যখন তা ওঠানো হয়
পাত্রের নাম বিস্মৃত হয়ে যায়। পানির
অন্ধকারকে বিবেচনা করো, যার কোনো ঘ্রাণ নেই
কিংবা তা গভীরতাও কমাতে পারে না
তবুও জাহাজের বাঁকানো অগ্রভাগ
বেড়ার সামনের ঘোড়ার মতো খিলান ছড়িয়ে দেয়
অর্কেস্ট্রা দাঁড়ায় এবং অর্কেস্ট্রা চলে যায়
বাড়ির দীর্ঘপথে, আমি তোমার মুখ দেখার প্রতীক্ষায় থাকি।
