কুর্দিস্তানের দিনগুলি

শান্তির আয়নায় দেখা কুর্দিস্তান

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:৫৩

মিল্টন বিশ্বাস

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামস রচিত ‘কুর্দিস্তানের দিনগুলি’ সামরিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বাংলা সাহিত্যে ইতিমধ্যে আমরা এ ধারায় বেশকিছু গ্রন্থ পেয়েছি। বিশেষত এখানকার সেনা কিংবা পুলিশ সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন অশান্তিময় রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত হয়ে সেখানকার অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন উপন্যাস, ট্রাভেলগ অথবা গবেষণাগ্রন্থ। যেমন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বায়েজিদ সরোয়ারের ‘কম্বোডিয়া’ সামরিক সাহিত্যের একটি অনবদ্য গ্রন্থ। তিনি শান্তি মিশনের সদস্য হিসেবে কম্বোডিয়ায় দায়িত্ব পালন করে দেশে ফিরে গ্রন্থটি রচনা করেন। অনুরূপভাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামস সংঘাতময় ইরাকের কুর্দিস্তানে ১৯৯৬ সালে শান্তিরক্ষী হিসেবে গমন করে ১৩ মাস অবস্থান করেন এবং সেসময় ডায়েরিতে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করে রাখেন। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে আলোচ্য গ্রন্থটি রচনা করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, এটি ‘ট্রাভেলগ’ জাতীয় রচনা। বাল্যকাল থেকে তিনি বিভিন্ন ভ্রমণকাহিনি পাঠ করে বিশ্বের নানা স্থান সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। ফলে তাঁর উত্সাহী ও অনুসন্ধিত্সু মন যেখানে গেছেন সেখান থেকে নিংড়ে নিয়েছেন ঘটনাবহুল অজস্র উপকরণ। ফলে গ্রন্থ রচনায় সেই উপকরণকে অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন।

১৫৬ পৃষ্ঠার আলোচ্য গ্রন্থটিতে ইরাকের অতীত-বর্তমানকে খুঁজে পাওয়া যায়। একইসঙ্গে সংঘাত ও দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে একজন সেনাসদস্য হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি এলাকায় তাঁদের কার্যক্রমের চিত্র প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তিনি ইরাকের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণের সূত্রে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার আদিগন্ত রেখা স্পর্শ করেছেন, কখনো বা ধর্মীয় নিদর্শনগুলোতে উপস্থিত হয়ে মুগ্ধ হয়েছেন কিংবা সেখানকার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। একদিকে যেমন বাংলাদেশ থেকে ভিন্ন মানুষ ও পরিবেশ দেখে আপ্লুত হয়েছেন, তেমনি কুর্দিদের দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি আর মানুষের সঙ্গে মানুষের হূদয়ের সংযোগ—সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়েছে বিচিত্র ঘটনার বর্ণনায়।  

লেখক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ‘ইরাকের কুর্দিদের দেশ’কে আনুষ্ঠানিকভাবে কুর্দিস্তান অঞ্চল বলা হয়। এটি ইরাকের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। মধ্যপ্রাচ্যের এই এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কুর্দি জাতি, যারা কুর্দি ভাষায় কথা বলে ও কুর্দি সংস্কৃতি লালন করে। আধুনিককালে কুর্দিস্তান চার ভাগে বিভক্ত। ইরাকি কুর্দিস্তান ছাড়াও অপর তিনটি হচ্ছে তুরস্কের পূর্বের কিছু অংশ (তুর্কি কুর্দিস্তান), দক্ষিণ-পশ্চিম ইরান (ইরানি কুর্দিস্তান) এবং উত্তর সিরিয়া (সিরীয় কুর্দিস্তান)। ভৌগলিকভাবে কুর্দিস্তান অঞ্চলটি জগ্রোস পর্বতমালার উত্তর-পশ্চিম অংশ এবং তোরোস পর্বতমালার পূর্বাংশ নিয়ে গঠিত। এছাড়া আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সামান্য কিছু এলাকাকেও কুর্দিস্তানের অন্তর্গত গণ্য করা হয়। ইরাকি কুর্দিস্তান মূলত চারটি বড় শহর নিয়ে বিস্তৃত। এর রাজধানী ইরবিলে। কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ডহুক, ইরবিল ও সোলেমানিয়া—এই তিনটি প্রদেশ রয়েছে। অন্যদিকে কারকুক বিখ্যাত মানসম্পন্ন তেলের জন্য। কারকুক নিয়ে এখনো একটা চাপা উত্তেজনা আছে ইরাক এবং কুর্দিস্তানের মধ্যে। ভৌগোলিকভাবে এটা কুর্দিস্তানের অংশ, কিন্তু তেল সম্পদের কারণে ইরাক চায় এটা তাদের দখলে রাখতে। লেখক ‘কুর্দিস্তান-কুর্দিদের আবাস ভূমি’ শীর্ষক অধ্যায়ে স্থানটির বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে পাঠক সহজেই দেখতে পাবেন লেখক কেবল ইতিহাস বলতে উত্সাহী নন, তিনি মানবজীবন ও নৈসর্গিক দৃশ্যাবলির সৌন্দর্য আবিষ্কারে নিবেদিত। এছাড়া তিনি যে মিশনে গিয়েছিলেন সেই বাস্তবতাও তাঁর মনে ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের সঙ্গে ইরাকের চুক্তির ভিত্তিতে ইরাকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় কুর্দি জনগণের সাহায্যের জন্য কর্মরত মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে নিরাপত্তা প্রদানের জন্য শান্তিরক্ষী নিযুক্ত করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ এই মিশনে শান্তিরক্ষী পাঠায়। প্রথমে বাগদাদে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শেষে গার্ড কন্টিনজেন্টের সদস্যরা কুর্দিস্তানের ইরবিল, ডহুক ও সোলেমানিয়া প্রদেশে দায়িত্ব পালন করতে চলে যান। স্বয়ং লেখকও এভাবে ১৯৯৬-৯৭ সালে সেখানে পৌঁছান। সেসময় তিনি জেনেছেন, কুর্দিস্তানে প্রায় পঁচিশ লক্ষ মাইন পোঁতা। গবাদিপশুর চারণভূমি, চাষাবাদের জমি সবই মাইনের কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী। রাস্তাঘাটও ছিল মাইনের কারণে বিপদজনক। ওই সময় সেখানে যেসব বিদেশি এনজিও কুর্দিদের সাহায্যের জন্য কাজ করত তাদের সহযোগিতা করতেন শান্তিরক্ষীরা। এছাড়া কুর্দিস্তানের বিবদমান দলগুলোর মধ্যে শান্তি স্থাপনেও গার্ড কন্টিনজেন্ট সহায়তা এবং অস্ত্রবিরতি সঠিকভাবে মেনে চলছে কি না তা পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিত করতেন। এই মিশন ২০০৩ সালে কার্যক্রম শেষ করে। সেদিক থেকে একটি দুর্দশাগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয় লেখক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসের।

মূলত ‘কুর্দিস্তানের দিনগুলি’ সহজ-সরল ভাষায় রচিত বাংলাদেশের একজন সেনাসদস্যের শান্তিরক্ষার বয়ান। একটি অপরিচিত জনপদে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামস যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তা এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে উন্মোচিত হয়েছে। গ্রন্থটি এই অজানা প্রান্ত উন্মোচনের জন্য পাঠকপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হবে।