মিজান মনির
নিভে গেলো বসুন্ধরা রাতের আকাশ
অঝোরে বৃষ্টিবন্দনা মাটির প্রদীপ
ক্ষত চোখ বীজতলা কারিগরে শিল্প
অম্লান জানালা বামে-ডানে শব্দঘ্রাণ। ... (নূরজাহান)
২
... নিত্যদিন ওঠানামা পাখির পালক
পৃথুলা আসেনা জলে ভাসে জন্মভূমি। ... (অজ্ঞাত আগুন)
যে কবিতা মন-মেধাকে আক্রান্ত করতে পারে না, হূদয়কে নাড়া দেয় না, বহুদূরের সময়কে হাতের তালুর মধ্যে নান্দনিকতায় উপস্থাপন করতে পারে না, সে রকম কবিতা সুখপাঠ্য হলেও আত্মায় আন্দোলনের মতো নিবিড়পাঠ্য নয়। সময়ের তরুণ কবি নিলয় রফিকের ‘অজ্ঞাত আগুন’ চতুর্থ কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশকাল ২০১৯। এর আগে ‘বিশুদ্ধ বিষাদে ভাসি আমি রাজহাঁস’ (২০১৪); ‘পিপাসার পরমায়ু’ (২০১৬); ‘নোনামানুষের মুখ’ (২০১৭) প্রকাশিত হয়েছে। বোঝাই যায়, একটি গ্রন্থ নির্মাণের জন্য কবি যথেষ্ট সময় নিয়েছেন। এই স্থিতধী নির্মাণের জন্য যে অনুধ্যান প্রয়োজন তাতে একটি গ্রন্থ থেকে পরবর্তী গ্রন্থে যেতে এরকম সময় সত্যিই অপরিহার্য ছিল। বলা বাহুল্য, কবিতাকে কি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে বাঁধা যায়! কবিতা তার আপন গতিতে চলে। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মনীষী কবিতাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কোলরিজের মতে, ‘শ্রেষ্ঠতম বিন্যাসের শব্দগুলোর প্রকাশই কবিতা।’ ওয়ার্ডস ওয়ার্থের মতে, ‘কবিতা সব জ্ঞানের মূল্যবোধ, সৌন্দর্য প্রকাশ।’ এভাবে বিভিন্ন কবি বিভিন্নভাবে সংজ্ঞা দিয়েছেন। আসলে কবিতা হলো সকল প্রাণের মোহনা, যেখানে প্রাণ আর মন এক হয়ে গান গেয়ে ওঠে, যেখানে স্বর্গের সব শান্তির আলোরা একত্রিত হয় এক অন্যরকম মধুময় শান্তির পরশ পেতে। মানুষ চিন্তা করতে পারে। চিন্তাশীল মানুষই সংবেদনশীল। চিন্তা মূলত একধরনের নিজস্ব ভ্রমণ। চিন্তাই মানুষকে অনুসন্ধানে উত্সাহিত করে। চিন্তাই উপলব্ধিকে বাড়িয়ে দেয়, সচেতন করে, মনোজগতে নিষ্ক্রিয় চিন্তাকে চেতনস্তরে নিয়ে আসে। চিন্তার এই ভ্রমণ থেকে দর্শনের সৃষ্টি। অধিবিদ্যক ধারণাগুলো চিন্তার ভ্রমণ থেকেই সংগৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত, কল্পনা ও অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়ে অনুসন্ধানকে নিয়ে যায় নির্মাণের দিকে। লেখক কবি বা সৃজনশীল মানুষ চিন্তার ভ্রমণ থেকেই নির্মাণকলায় উদ্দীপনাগুলোকে কাজে লাগান। প্রকাশে সে সব হুবহু তেমন থাকে না, এগুলো স্বপ্নের দৃশ্যপটের মতো বদলায়, তখন প্রকাশে এর জটিলতাগুলো স্ফূর্ত হয়। দ্বিতীয় দশকের প্রতিভাবান তরুণ কবি নিলয় রফিক সেই মায়াবী চিন্তার জগতেই ফাঁদ পেতে আছেন একটি প্রণয়মুগ্ধ কবিতার জন্য। তাঁর কাব্যজ্ঞান গোছালো বললে কম হবে, বলা যায় স্বতন্ত্রভাবে গোছালো। নিলয় রফিক ছন্দজ্ঞানে টানটান। কবি নিলয় রফিকের ‘সনেটগুলো সৌন্দর্যমণ্ডিত’। নিঃসন্দেহে ‘অজ্ঞাত আগুন’ কাব্যগ্রন্থটি এবার মাঠ দাবড়ে বেড়াবে অনেক পাঠকের মন-হূদয়ে। এই গ্রন্থে আছে চল্লিশটি (৪০) কবিতা। যারা আগে কখনো কবি নিলয় রফিকের কবিতা পড়েননি কিংবা অল্পস্বল্প পড়েছেন তাঁদের জন্য এই বই বলা যায় পূর্ণাঙ্গ এক আয়োজন। নিলয় রফিকের কবিতার সব রকম বৈশিষ্ট্যই ধারণ করেছে এটা। একই অঞ্চলের বাসিন্দা বলে নিলয় রফিকের কবিতার সঙ্গে বেশ আগে থেকেই পরিচিত। আমি তাঁর বেশ কিছু কবিতা পড়েছি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় দৈনিকে। দ্বিতীয় দশকের তরুণ কবি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে সচেষ্ট। কখনো কখনো তাঁর কোনো কবিতার পুরোটা অথবা কিছু পঙিক্ত আমার ভালো লাগত। আজ বলতে দ্বিধা নেই, সেই ভালো লাগাটার রস আরো দ্বিগুণ হলো ‘অজ্ঞাত আগুন’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ে। ‘অজ্ঞাত আগুন’ কাব্যগ্রন্থটি পুরোপুরি পাঠ করার পর মনে হয়েছে, এখানে আমি অন্য এক নিলয় রফিককে দেখতে পাচ্ছি। বেশ কল্পনাসচ্ছল এবং হূদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতার ধরন।
