দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সংসদ সদস্য হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার শপথ নিলেন ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রানীশংকৈল) আসন থেকে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচিত ছয়জনের মধ্যে তিনিই প্রথম শপথ নিলেন। এখন জোর গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির অবশিষ্ট পাঁচজনের মধ্যে আরো একাধিকজন সহসাই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন। শপথ নিয়ে জাহিদও সাংবাদিকদের বলেছেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকি চারজনও শপথ নিতে পারেন।
বিএনপির জাহিদুর রহমানও শপথ নেওয়ায় এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তাদের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা না থাকা নিয়ে। এ নিয়ে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তারা শপথ নিলেও তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে না।
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যরিস্টার খায়রুল গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বিএনপির যিনি শপথ নিয়েছেন এবং আরো কেউ শপথ নিলে দল যদি বহিষ্কার করে তাহলেও তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে না। কারণ তারা সংসদে ফ্লোর ক্রসিং করছেন না। বরং বিষয়টি আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক রসায়নে গড়ালে ভিন্ন ঘটনাও ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে যিনি সংসদে গেছেন বা যারা যাবেন তারাই পেতে পারেন বিএনপি ও দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ এর মূল প্রতিনিধিত্ব।
এর আগে দলের বারণ উপক্ষো করে শপথ নিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর (মৌলভীবাজার-২) ও মোকাব্বির খান (সিলেট-২)। সুলতান-মোকাব্বিরের পথ ধরে এবার খোদ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ের জাহিদও সংসদে। ফলে চলতি একাদশ সংসদ বিএনপি ও গণফোরামসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেরও প্রতিনিধিত্ব পেল।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আটজন সংসদে যাবেন কী যাবেন না—এ নিয়ে ভেতর-বাইরে নানামুখী জল্পনা-কল্পনা চলছিল। এরমধ্যেই গত ৭ মার্চ সুলতান মনসুর ও ২ এপ্রিল শপথ নেন মোকাব্বির। গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বৈঠকে স্কাইপে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। দল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুইদিন পরেই শপথ নেন জাহিদুর রহমান। সংসদ সদস্য পদ টিকিয়ে রাখতে হলে আগামী ২৯ এপ্রিল সোমবারের মধ্যেই শপথ নিতে হবে বিএনপির বাকি পাঁচজনকে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের নির্ধারিত সময়সীমা ৯০ দিন পূর্ণ হবে সোমবার। এই সময়ের মধ্যে শপথ না নিলে তাদের আসন শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
গতকাল দুপুরে জাহিদ শপথ নেওয়ার পর বিকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর শপথ নিয়ে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের জাহিদ বলেছেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নিয়েছি। দল আমাকে বহিষ্কার করতে পারে জেনেও আমি শপথ নিয়েছি।’
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাহিদ শপথ নেওয়ায় বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করলে তার আসন শূন্য হবে কি না তা নিয়ে কথা উঠেছে। বিএনপির আরো কেউ শপথ নিলে তারাও যদি বহিষ্কার হন তাহলে কী হবে? এই প্রশ্ন এখন প্রায় সব মহলে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘না, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেওয়ার কারণে বিএনপির জাহিদুর রহমানের এমপি পদ বাতিল হবে না। পার্টি তাকে বহিষ্কার করতে পারে। যেহেতু তিনি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেননি তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার এমপি পদ বহাল থাকবে। পদত্যাগ করলে ৭০ অনুচ্ছেদ মতে এমপি পদ হারাতেন।’
একাধিক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, দশম সংসদে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিজেই আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করায় তার আসন শূন্য হয়েছিল। আর অতীতে যাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছিল তাদের বিষয়টি আর বিএনপির জাহিদুর রহমানের প্রেক্ষাপট এক নয়, অতীতে যারা ফ্লোর ক্রস করেছিলেন তাদের সদস্য পদ গিয়েছিল। কিন্তু জাহিদুর রহমান তো ফ্লোর ক্রস করেননি।
জাহিদুর রহমান ছাড়াও একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে আরো যে পাঁচজন নির্বাচিত হয়েছেন তারা হলেন- বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মো. হারুন অর রশীদ, ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া।
কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে যদি তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথগ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন। তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হাইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’ উল্লেখ্য, একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ৩০ জানুয়ারি। সেই অনুযায়ী ৯০ দিন পূর্ণ হবে আগামী সোমবার।
আর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।’
দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এমপি হিসেবে শপথ নিতে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। কেউ দল-জোটের অবস্থানের বাইরে গিয়ে এমপি হিসেবে শপথ নিলে তার সদস্যপদ শূন্য হবে কি না, এ ব্যাপারে অবশ্য সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অতীতে বিএনপি দলীয় দুইজন সংসদ সদস্য তত্কালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগে যোগদান করায় পরবর্তীকালে তাদের এমপি পদ বাতিল হয়েছিল। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। নবম সংসদে সাতক্ষীরা-৪ আসনে এমপি ছিলেন এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা এইচ এম গোলাম রেজা। এমপি থাকাকালেই দল তাকে বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদ শূন্য হয়নি। অবশ্য জাপা তখন এ ব্যাপারে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
