মাতুয়াইলে ময়লার ভাগাড়ে পাওয়া অজ্ঞাত এক নারীর লাশের তদন্ত করতে গিয়ে আরেক নারী খুনের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। তবে ওই অজ্ঞাত নারীর লাশের পরিচয় পুলিশ এখনও বের করতে পারেনি। লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের মরচুয়ারিতে কয়েকদিন রাখার পর আজিমপুর কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করেছে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম।
ওই নারীর লাশের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে পুলিশ চট্টগ্রামের রাউজান এলাকায় হত্যাকান্ডের শিকার আরেক নারীর সন্ধান পেয়েছে। যার নাম আমেনা খাতুন। তার স্বামী ও বন্ধু মিলে হত্যার পর লাশটি রাউজানের একটি সড়কের পাশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে রাউজান থানা পুলিশ আমেনা খাতুনের স্বামী বাদশা ও তার বন্ধু আক্তারকে গ্রেফতার করেছে।
জানা গেছে, গত ১৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল ল্যান্ড ফিল্ডের (সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলার স্হান) ময়লার স্তূপ থেকে অজ্ঞাত এক নারীর (২৫) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই মুকিত হাসান।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ডেমরা জোন) দ্বীন মোহাম্মদ জানান, যে স্হান থেকে অজ্ঞাত ওই নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি একটি বিস্তীর্ণ এলাকা। পুরোটাই ময়লার স্তূপ। সেখানে দুটি ছোট ঘর রয়েছে। ওই ঘরে কয়েকজন শ্রমিক থাকতেন। ঘটনার পর থেকেই তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই নারীর লাশ শনাক্ত করতে হাতের বালা কাপড় ও চুল থেকে নমুনা সংরক্ষণ করে সিআইডির ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর ওই নারীর খোঁজে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, নরসিংদী, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জ থেকে স্বজনরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মরচুয়ারিত লাশ দেখতে আসেন। গত ২০ ডিসেম্বর কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এলাকা থেকে নূর হোসেন ও তার স্ত্রী শফিদা বেগম আসেন তাদের নিখোঁজ মেয়ের সন্ধানে। যাত্রাবাড়ী থানায় সংরক্ষণ করা হাতের দুইটি বালা দেখে শফিদা বেগম শনাক্ত করেন যে বালা দুইটি তার মেয়ে আমেনা খাতুনের। পরে তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মরচুয়ারিতে লাশের পায়ের আঙ্গুল দেখে কিছুটা নিশ্চিত হন যে এটি তাদের মেয়ে আমেনা খাতুন। পরবর্তীতে পুলিশ আমেনা খাতুনের বাবা ও মায়ের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে পাঠায়।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, কুতুবদিয়া থেকে আসা ওই দম্পতির কাছ থেকে পুলিশ আমেনা খাতুনের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে। তথ্য প্রযুক্তির বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে আমেনার মোবাইল ফোন সেটটি চট্টগ্রামের স্টেশনে রোড এলাকায় রয়েছে। পরে ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের কোতয়ালি থানাধীন স্টেশন রোড এলাকা থেকে ওই মোবাইল সেটটিসহ আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়। আক্তারের দেওয়া জবানবন্দি অনুসারে দুই দিন পর মোবাইলের মালিক আমেনার স্বামী বাদশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন শনাক্ত হয় যে আমেনা খাতুনের লাশ রাউজান থানা পুলিশ গত ২০ নভেম্বর একটি সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। রাউজানে লাশ উদ্ধারের বিষয়টি আমরা পরে আমেনার বাবা-মাকে জানাই। তারা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গিয়ে তাদের মেয়ের লাশ শনাক্ত করে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাদশা জানায়, কক্সবাজারে শুঁটকি ব্যবসায়ী নূর হোসেনের মেয়ে আমেনা খাতুনের সঙ্গে পরিচয়ের পর গত ১৫ নভেম্বর তারা বিয়ে করেন। বাদশা চট্টগ্রামে প্রাণ গ্রুপের একটি পণ্যের সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। বিয়ের পর তারা কোতয়ালি থানা এলাকায় ৩ হাজার টাকায় একটি টিনশেড বাসা ভাড়া নেন। ১৯ নভেম্বর আমেনা, বাদশা ও আক্তার সিএনজিতে করে কাপ্তাই হ্রদের দিকে ঘুরতে যায়। ঘোরাঘুরির এক পর্যায়ে রাত ৯ টার দিকে আক্তারের সহায়তায় বাদশা আমেনার গলায় ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে লাশটি রাউজান রোডের একপাশে ফেলে পালিয়ে যায়। পরদিন রাউজান থানা পুলিশ আমেনার লাশ অজ্ঞাত পরিচয় হিসাবে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।
যাত্রাবাড়ী থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মুকিত হাসান বলেন, ময়লার স্তুপ থেকে নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে চট্টগ্রামের রাউজান এলাকায় এক নারী হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। তবে অজ্ঞাত নারীর পরিচয় এখনও শনাক্ত হয়নি। এ ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত করে যাচ্ছে।
