দুবলারচরে জেলেদের দুর্বিষহ জীবন, খাওয়ার পানির তীব্র সংকট

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:২৯

বঙ্গোপসাগর উপকুলে সুন্দরবনের দুবলারচরে চলছে শুঁটকি মৌসুম। সাগর থেকে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে জেলেপল্লির হাজারো জেলে-মহাজনের। দুবলার জেলেপল্লি থেকে প্রতি মৌসুমে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও জেলেদের সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ আয়োজন নেই। স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি, দুর্যোগে আশ্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি সেবা জেলেরা পায় না।

জেলেদের কাছ থেকে জানা যায়, পূর্ব সুন্দরবনের আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, শ্যালারচর, নারিকেলবাড়ীয়া চরের চারটি জেলেপল্লিতে প্রায় ১০ হাজার জেলে সাগরের মাছ ধরে শুঁটকি করে। এক সময় ২৫টির বেশি জেলেপল্লি পূর্ব সুন্দরবনের কচিখালী থেকে পশ্চিম সুন্দরবনের নীলকমল-মান্দারবাড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যেখানে মৌসুমে লক্ষাধিক মত্স্যজীবীর অস্হায়ী বসতি ছিল বলে মৎস্য ব্যবসায়ী শাহনুর রহমান শামীম জানান। এসব পল্লিতে একসময় সুদূর কক্সবাজার-চট্টগ্রামের বহরদাররা আসতেন হাজারও মত্স্যজীবীসহ। এছাড়া পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীর হাজার হাজার জেলেও ছিলেন। ১৯৯৯ সালের পর সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য ঘোষণা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য তথা বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট সংরক্ষণের জন্য জেলে পল্লি স্থাপন সংকোচিত করা হয়। দুবলা থেকে আহরিত শুঁটকি মাছ চট্রগ্রাম, ঢাকা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৎস্য ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান।

শরণখোলার রায়েন্দা গ্রামের মত্স্যজীবী ইউনুস আলী ফকির বলেন, তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে বছরে চার মাস দুবলারচরে অবস্থান নিয়ে মাছ শুঁটকি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। দুবলারচরের জেলেরা বন বিভাগ তথা সরকারকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করে থাকেন। দুবলা ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, দুবলারচরে জেলেদের সরকারিভাবে কোনো চিকিৎসার সুবিধা নেই, খাওয়ার পানির ব্যবস্থা নেই, নেই দুর্যোগে জেলেদের আশ্রয় নেওয়ার কেন্দ্র। ফলে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে জেলেদের ছোট ছোট খালে নৌকা-ট্রলারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। পানির জন্য খননকৃত মেহেরআলীর চর ও অফিসকিল্লার চরের পুকুর দুটি সাগরে ভেঙে গেছে। অন্য ছোট পুকুর ও কুয়া জলোচ্ছ্বাসে লোনাপানি দ্বারা প্লাবিত হয় বলে খাবার পানি সংকট অবর্ণনীয়। এনজিও নির্মিত পাঁচটি সাইক্লোন শেল্টারই ধ্বংসের মুখে। ২০০৭ সালে সিডর ও ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দুবলার চরে শ শ জেলে মারা যান। জেলেপল্লি দুবলা ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহলাদ চন্দ্র রায় বলেন, প্রতি বছর দুবলারচরে শুঁটকি থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত চার বছরের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ কোটি ১৭ লাখ ৫০৮ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯৯ টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৮৪১ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ কোটি ২২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থ বছরে জানুয়ারি পর্যন্ত ২ কোটি ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৬৪৪ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, দুবলারচর মৌসুমি মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র বলে সেখানে সেবার সুযোগ সীমিত। আগামী বছর দুবলারচর ও শেলারচরে দুটি সাইক্লোন শেল্টার কাম অফিস নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া জেলেপল্লি ও বিভিন্ন বন অফিসের কাছে পুকুর খনন-পুনঃখনন করা হবে। এনজিওদের মাধ্যমে ভাসমান হাসপাতাল স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

ইত্তেফাক/ আরাফাত