অনেক কাল আগে ছিলেন খুবই দয়ালু এক রাজা।
একসময় রাজা বুড়ো হলেন। জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে গেছেন। সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন একমাত্র ছেলেকে। রাজমুকুট পরিয়ে দিয়েছেন। বুড়ো রাজার আকাঙ্ক্ষা: ছেলে তার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হবে।
ছেলেকে রাজা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সময় দুটি অনুরোধ করলেন। দেশের সব মানুষের যাতে ভালো হয়, তারা যেন সুখে শান্তিতে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে দিনরাত কাজ করতে হবে। দ্বিতীয় অনুরোধ: বুড়ো বয়সে যেটুকু যত্ন সেবা দরকার, সেটুকু যেন পাওয়া যায়।
নতুন রাজা কথা দিলেন। বাবার সামান্য দুটি অনুরোধ তিনি রাখবেন। প্রতিশ্রুতি পেয়ে আশ্বস্ত হলেন পিতা। রাজ্য ভালোই চলছে। নতুন রাজা প্রজাদের দেখভাল করেন আন্তরিকতা নিয়ে। বাবার উপদেশ-পরামর্শ মেনে চলেন অক্ষরে অক্ষরে।
পরিস্থিতি পালটে গেল। নতুন রাজা বিয়ে করলেন। রানি আসবার পর সবকিছু কেমন ওলটপালট হতে শুরু করল। রানি বুড়ো রাজাকে পছন্দ করলেন না। ছেলে যে এত বাপ অন্তপ্রাণ—এটা তার সহ্য হয় না। নতুন রাজা বউয়ের চাইতে বাবার কথার গুরুত্ব দেন বেশি। এটা মেনে নিতে পারেন না নতুন রানি। স্বামীকে বলেই ফেলেন, খাবার টেবিলে তোমার বাবা সব সময়েই কাশতে থাকেন। খুকখুক কাশি শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা। খাওয়াদাওয়ার কোনো রুচি থাকে না। সবসময় উনি তোমাকে শিশু ভাবেন। নানরকম জ্ঞান দিতে থাকেন। এখন তুমি রাজা। দেশ চলবে তোমার হুকুমে।
রানির এসব হিংসুটেপনা নতুন রাজার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু তিনি নিরুপায়। বউয়ের কথার প্রতিবাদ করবেন, সেই সাহসও নেই। রোজ রোজ এমন ঘ্যানর ঘ্যানর কত ভালো লাগে? বড্ডো বিরক্ত তিনি।
একসময় তিনি বুড়ো বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলেন। বুড়ো রাজাকে মাটির নিচের বদ্ধ একটা ঘরে নজরবন্দি করা হলো। দিনরাত প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকে সেই ছোট্ট কুঠুরির বাইরে। বদ্ধ ঘরের পরিবেশ মোটেই সুবিধের নয়। নোংরা, স্যাঁতসেঁতে। ভীষণ ঠান্ডাও। পোষা কুকুর-বেড়ালকেও বুঝি মানুষ এর চেয়ে ভালো অবস্থায় রাখে। বৃদ্ধ রাজার মন্দ বরাত। বিনা দোষে এসব অত্যাচার ও নির্যাতন তাঁকে সইতে হচ্ছে। প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা বা সম্ভাবনা নেই।
কয়েক বছর কেটে গেল এর মধ্যে। বৃদ্ধ রাজার বন্দিদশা কাটেনি। হয়তো বাকি জীবনে কাটবেও না।
নতুন রাজার একটি ছেলে হয়েছে। তার স্বভাবচরিত্র বেশ ভালো। বন্দি বুড়ো রাজার ভীষণ ভক্ত সে। প্রতিদিনই দাদুর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটায়। বৃদ্ধ রাজার কাছে রাজকুমারের আসা-যাওয়ার ব্যাপারটি তার মায়ের ভীষণ না-পছন্দ। ছেলেকে অনেক বারণ করেছেন। ফল হয়নি কোনো। দাদুর কাছে সে যাবেই। দাদুকে যেসব খাবার দেওয়া হয়, তা মোটেও ভালো না। সে নিজে খাবারদাবার নিয়ে যায় তাই।
একদিন দাদু বললেন, প্রচণ্ড শীতে কষ্ট পাচ্ছি আমি। দাদুভাই যদি পারো, আমাকে একটা কম্বল এনে দিয়ো।
ভালো একটা কম্বল জোগাড় করা হলো। কম্বল পেয়ে একটানে ছিঁড়ে দুই টুকরা করে ফেলল। ব্যাপারটা খেয়াল করলেন তার বাবা। রাজপুত্র কম্বলটা দুই টুকরা কেন করল? ছেলেকে রাজা জিগ্যেস করলেন, এই কম্বল দিয়ে কী করবে তুমি? আর কম্বলটাকে দুই টুকরাই বা করলে কেন?
রাজকুমার জবাব দেয়, তোমার বাবার ঘরে ভীষণ ঠান্ডা। উনার বিছানায় পেতে দেব বলে আধখানা কম্বল নিয়ে যাচ্ছি।
রাজার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। ছেলেকে শুধান, আর বাকি অর্ধেকটা? সেটা দিয়ে কী করবে?
রাজকুমার বলে, বাকি অর্ধেকটা রেখে দিচ্ছি তোমার জন্যে। ভবিষ্যতে আমি যখন রাজা হবো, এই আধখানা কম্বল তখন তোমার কাজে লাগবে।
রূপান্তর: হাসান হাফিজ
