মিয়ানমারের মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিজিবির ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে: ডিজি বিজিবি

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৯:৫৫

‘মিয়ানমারের চোরাকারবারিরা (বিজিবি) চোখ ফাঁকি দিয়ে চায়ের প্যাকেটের ভেতর লুকিয়ে ও মাছের বরফের সঙ্গে নতুন মাদক আইস বাংলাদেশে পাচার করছে। এক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। বিজিবি সদস্যরাও গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্তে আইসের চালান প্রতিহত করছে। এ নিয়ে মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিজিবির ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে।’ সীমান্ত পথে মিয়ানমার থেকে দেশে অনবরত আইস প্রবেশ প্রসঙ্গে এমনটিই বলেছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম। 

বৃহস্পতিবার (১৭ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বায়তুল ইজ্জতে অবস্থিত বিজিবি ট্রেনিং সেন্টার এন্ড কলেজের (বিজিটিসিএন্ডসি) বীর উত্তম মুজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বিজিবি মহাপরিচালক। 

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম। ছবি: ইত্তেফাক

বিজিবি ডিজি বলেন, আইস সীমান্ত দিয়ে আসলেও তা ঢাকায় যাচ্ছে। ঢাকার অভিজাত পরিবারের লোকেরা উচ্চমূল্যের এই মাদক সেবন করেন। তাই যতদিন পর্যন্ত মাদকের চাহিদা কমানো ও এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না, ততদিন পর্যন্ত মাদকের চালানও ঠেকানো সম্ভব নয়। 

মিয়ানমারের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রসঙ্গে ডিজি বলেন, অরক্ষিত এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা যায়, কাঁটাতারের বেড়াও দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুদিন পরে গিয়ে যদি দেখা যায়, কাঁটাতারের বেড়া চোরাকারবারিরা সরিয়ে ফেলেছে। তাহলে তো সমাধান হলো না। তাই আমরা সশরীরে প্রতিহত করতে চাই। তবে সীমান্ত সড়ক হয়ে গেলে চোরাচালানসহ এসব কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। 

মাদকসহ চোরাচালান কারবারিদের সঙ্গে কোন বিজিবি সদস্য জড়িত নয়-এমনটি জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, বিজিবি এ ব্যাপারে কঠোর। কোন সদস্য জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সক্ষমতায়, প্রশিক্ষণে ও অপারেশনাল কার্যক্রমে আমরা আকাশ ছু্ঁতে চাই। তবে আশা আছে, আরও বহুদূর যাওয়ার, অনেক কিছু করার।

বিজিবিতে যুক্ত হলো ৮৮৫ নবীন সদস্য

৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ ও শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ৮৮৫ জন সদস্য নতুন করে বিজিবিতে যুক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন বিজিবির ডিজি। এরপর সশস্ত্র সালাম প্রদানের মধ্য দিয়ে নবীন সৈনিকদের শপথ গ্রহণ ও প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের প্যারেড কমান্ডার হিসেবে মনোজ্ঞ এ প্যারেড পরিচালনা করেন ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের অফিসার ইনচার্জ মেজর মো. সেলিমুদ্দোজা এবং প্যারেড এ্যাডজুটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। 

৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ শেষে বিজিবি মহাপরিচালক নবীন সৈনিকদের উদ্দেশে বিভিন্ন উপদেশ ও দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, বিজিবি আজ একটি সুসংগঠিত, চৌকস, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার দেশপ্রেমী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। বিজিবি ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিমি দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষা, সীমান্ত ভূমি ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, সীমান্তে চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার রোধসহ সব ধরণের সীমান্ত অপরাধ দমনসহ দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সফলতার সাথে পালন করে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান, যেকোনো দুর্যোগময় মুহূর্তে জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিজিবি বিশ্বস্ততা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে সেবা ও কর্তব্য পরায়ণতার মাধ্যমে সমগ্র জাতির শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, প্রত্যেকের মনে রাখতে হবে-শৃঙ্খলাই সৈনিকের মূলভিত্তি। আদেশ ও কর্তব্য পালনে যে কখনো পিছপা হয় না সে-ই প্রকৃত সৈনিক। সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা, আনুগত্য ও নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মতৎপরতা, তেজ ও উদ্দীপনা একটি বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মাপকাঠি। নবীন সৈনিকরা এসব গুণাবলির প্রতিফলন ঘটিয়ে বাহিনীর ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখবে বলে তিনি আশা করেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর চারটি মূলনীতি-‘মনোবল, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা’-এ উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে বিজিবির ওপর অর্পিত যেকোনো দায়িত্ব সুশৃঙ্খল ও সুচারুরূপে পালন করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব পালনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।  

উল্লেখ্য, ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের মৌলিক প্রশিক্ষণ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর শুরু হয়। বিজিটিসিএন্ডসিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া মোট ৬৭০ জন রিক্রুটের মধ্যে ৬২১ জন পুরুষ এবং ৪৯ জন নারী রিক্রুট প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া একই দিনে ও একই সময়ে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬বিজিবি) প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের ২১৫ নবীন সৈনিকের মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ ২৪ সপ্তাহের অত্যন্ত কঠোর ও কষ্টসাধ্য এ প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করে বর্ণিত দুইটি ভেন্যুতে সর্বমোট ৮৮৫ জন নবীন সৈনিক আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ ও সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে তাদের সৈনিক জীবনের শুভ সূচনা করলো।

ইত্তেফাক/এএএম