স্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে ১৪ বছর পার

প্রধানমন্ত্রীর নজরে ত্রিশালের সোহেল-রওশন দম্পতি

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:১০

‘স্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে ১৪ বছর পার’-শারীরিক প্রতিবন্ধী এক নারী ও একজন মহত্প্রাণ পুরুষের প্রেম, বিয়ে ও সুখী দাম্পত্যজীবনের কাহিনী সম্প্রতি গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সোহেল-রওশন দম্পতির নজিরবিহীন সেই ভালোবাসার গল্পটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তা নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেওয়া হয়েছে নির্দেশনা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বিকালে তাদের বাড়িতে যান ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তারুজ্জামান।

বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক এনামুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ পাওয়ার পর আমি নিজে ঐ দম্পতির সঙ্গে কথা বলেছি। পরে সরেজমিন তাদের খোঁজখবর জানতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঐ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার। শুরুতেই সোহেল-রওশন দম্পতিকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও মেয়ে স্মরণীকে চকলেট উপহার দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তারুজ্জামান। পরে পরিবারটির নানা সমস্যা ও কষ্টের কথা শোনেন তিনি এবং সেগুলো দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানিয়ে সমাধানের আশ্বাস দেন।

ইউএনও আক্তারুজ্জামান বলেন, সোহেল-রওশন দম্পতি ভালোবাসার যে নিদর্শন তৈরি করেছেন তা অতিবিরল। পরিবারটির ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাব। তাদের খোঁজখবর নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সোহেল-রওশন দম্পতি।

১৪ বছর আগে ভালোবেসে রওশনের হাত ধরেন সোহেল। তাদের এই চলার পথ মোটেও সহজ ছিল না। কেননা আর দশটা মেয়ের মতো সুস্হ স্বাভাবিক নন ময়মনসিংহের ত্রিশালের রওশন আক্তার। জন্ম থেকেই দুই পা অচল রওশনের। পায়ে ভর দিয়ে নেই চলার শক্তিটুকুও। তবে প্রচণ্ড ভালোবাসার কাছে এসব শারীরিক প্রতিবন্ধিতা যে অতি তুচ্ছ ব্যাপার, তার প্রমাণ দিয়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোহেল মিয়া। ভবিষ্যতে নানা সমস্যা আসবে জেনেও সকলের অমতে বিয়ে করেন রওশন আক্তারকে। ত্রিশালের গুজিয়াম টানপাড়া গ্রামে ছোট্ট মাটির ঘর আর একটি টং দোকানই সম্বল এ দম্পতির। সংসারের অভাব-অনটন, শত দুঃখকষ্ট কোনো কিছুই তাদের ইস্পাতদৃঢ় ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র চিড় ধরাতে পারেনি।

আট ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সোহেল মিয়া। ছোটবেলায় হারিয়েছেন বাবা-মাকে। ভাই-বোনের কাছে থেকে পড়াশোনা করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভালো চাকরি নেন সোহেল। ঠিক সে সময়েই তার পরিচয় হয় শারীরিক প্রতিবন্ধী রওশন আক্তারের সঙ্গে। তাদের মধ্যে হয় প্রেম, পরিণতিতে বিয়ে। এক পর্যায়ে অসহায় স্ত্রীর পাশে থাকতে ছেড়ে দেন চাকরি। সোহেল মিয়া বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি করতাম। একদিন বিকালে অফিস ছুটির সময় আমার টেবিলের ড্রয়ারে থাকা ১০ টাকার নোটে একটি নম্বর লেখা দেখতে পাই। ঐ নম্বরে একদিন কল করি। সেই কলের মাধ্যমেই রওশনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আমাদের প্রেমের শুরু, ডিসেম্বরে আমরা বিয়ে করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম থাকলেও তার মধ্যে আমার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি আজ পর্যন্ত পাইনি। একজন স্বাভাবিক মেয়ে স্বামীর জন্য যতটুকু না করতে পারে সে তার চেয়েও বেশি কিছু করার চেষ্টা করে। সে আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। আর আমিও তার প্রতি পুরোপুরি দুর্বল।’

রওশন আক্তার বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী হওয়ায় আমার পরিবার থেকেও বিয়েতে সম্মতি ছিল না। সে সময় সবাই বলাবলি করেছে, বিয়ের পর সোহেল আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, আমি যাকে ভালোবাসব সেও আমাকে ভালোবাসবে। এই বিশ্বাসটাই আমি সোহেলের ওপর করতে পেরেছিলাম। সেজন্য সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার হাত ধরে আমি পালিয়ে যাই এবং বিয়ে করি। মেয়ে হওয়ার পর আমাদের ভালোবাসা যেন আরো বেড়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘কখনো কোথাও যেতে চাইলে আমি শুধু বলি আর সে তার পিঠে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করে। আমার চাহিদা পূরণের জন্য সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। তাকে আমি ধন-সম্পদ কিছুই দিতে পারিনি, শুধু আমার ভালোবাসাটুকুই দিয়েছি।’ এ প্রসঙ্গে সোহেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রেম পবিত্র, সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে পাওয়া।’

সোহেল-রওশনের এমন নজিরবিহীন ভালোবাসার বন্ধন রীতিমতো অবাক করে স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও। তারা বলেন, ‘সত্যিকারের প্রেম যে কতটা গভীর তা তাদের দেখেই আমরা বুঝতে পারি। রওশনকে পিঠে নিয়ে সোহেল যেভাবে আনা-নেওয়া করে তা দেখে আমরা সত্যিই অবাক হই।’

ইত্তেফাক/বিএএফ