খরস্রোতা তিস্তা প্রায় মরা নদী

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ২১:২৮

জেগে উঠেছে অসংখ্য চর!

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

এককালের খরস্রোতা তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ না থাকায় ও পলি জমে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। নাব্য সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে ভেসে যায় নদীর দুই কূল। সৃষ্টি হয় অকাল বন্যার। ক্ষতি হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি।

তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার। তন্মধ্যে ভারতে ২০০ কিলোমিটার, বাংলাদেশে ১৫০ কিলোমিটার। তিস্তা নদী প্রাকৃতির আশীর্বাদ, তাই এর স্বকীয় স্রোতধারা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নদীটি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এই নদীর ওপর ২৯টি বাঁধের মাধ্যমে স্বাভাবিক স্রোতধারা ব্যাহত করা হয়েছে। নাব্য সংকটের দরুন তিস্তা নদীকেন্দ্রিক লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার পথ বন্ধ করা হয়েছে।

মাঝিমাল্লা, খেয়াঘাট ঠিকাদার, শ্রমিক তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন শহর ও বন্দরে রিকশা কিংবা অটোরিকশা চালিয়ে, অনেকে আবার রাজমিস্ত্রির জোগালি কিংবা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে। এদিকে নাব্য সংকট ও নদীতে সামান্য পানি থাকায় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। মত্স্যজীবীরা বেকার হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। তিস্তা নদীতে অর্ধ শতাধিক খেয়াঘাট বন্ধসহ নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে নদীতে পানি না থাকায় সেচকার্য ব্যাহত হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের তিস্তা নদীর খেয়াঘাট ইজারাদার নবার আলী জানান, জেলা পরিষদ থেকে খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে চার/পাঁচ মাসের বেশি নৌকা চালাতে পারি না। সাধারণত আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্মিন মাসে নৌকা চলে। বাকি সময়ে হেঁটে তিস্তা নদী পাড়ি দেয় এলাকার জনসাধারণ।

জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার তিস্তা নদীর জেলে সম্প্রদায়ের কদম আলী, হারুনার রশিদ ও কুদ্দুস আলীসহ অনেকেই  জানান, আমরা পূর্বে তিস্তা নদীতে সারা বছর মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করেছি। এখন নদীতে পানি না থাকায় জেলে সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে গিয়ে গার্মেন্টসহ অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

একই উপজেলার দোয়ানী গ্রামের তিস্তা নদীর মাঝি সবুর মিয়া জানান, আগে সারা বছর নদীতে পানি থাকায় লোকজন পারাপার করে আমরা জীবিকানির্বাহ করেছি। এখন আর সেই উপার্জনের পথ নেই।

তিস্তাপাড়ের ছয়আনী গ্রামের কৃষক রহম আলী জানান, নদীর পানি না পাওয়ায় অনেক টাকা খরচ করে সেচ দিয়ে ফসল ফলানো হচ্ছে। অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতে নদী প্লাবিত হয়ে ফসলের হানী হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজার হাজার কৃষক পরিবার।  

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিস্তা ব্যারেজ বিভাগের নির্বাহী  প্রকৌশলী আব্দুল্লা-আল মামুন জানান,  তিস্তা নদীতে বর্তমানে দুই হাজার থেকে তিন হাজার কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। তা দিয়ে তিস্তা প্রকল্প এলাকার জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। দেশের বৃহত্তর তিস্তা ব্যারেজের ৪৮টি গেটের মধ্যে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি গেট দিয়ে পানি প্রবাহ হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হলেও সুদীর্ঘ ৪৭ বছরে  বৈঠকের পর বৈঠক করেও তিস্তা নদীর পানি বন্টনের চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। তিস্তা নদীতে ঐতিহাসিকভাবে বর্ষাকালে দুই লাখ ৮৯ কিউসেক পানি প্রবাহ ছিল। এই পানি প্রবাহের উপর ভিত্তি করে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া জেলার ছয় লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধার্থে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে দুই থেকে আড়াই হাজার কিউসেক পানি আসছে। তা দিয়ে জমিতে সেচকার্য চলছে। এদিকে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতে তিস্তা নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হচ্ছে। তিস্তার বুক জুড়ে এখন ধু ধু বালুচর।