উদীয়মান বাজারগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ 

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৮:৫৪

প্রতিরোধক বা প্রতিষেধক যাই বলি না কেন, ভ্যাকসিনের মাধ্যমে কোনো কিছুতেই প্রতিহত করা যাচ্ছে না করোনা ভাইরাস বিস্তারের দুরন্ত গতিকে। ক্ষণেক্ষণে রূপ পরিবর্তনই যেন কোভিড-১৯ ভাইরাসের স্বভাবজাত ধর্ম। আলফা, বিটা, গামা, ডেটা, লাম্বাডা, মু’র পর ওমিক্রন, প্রত্যেকটিই আবির্ভূত হচ্ছে কোনো না কোনো স্বতন্ত্র উপসর্গ নিয়ে। ভিন্নতার মাত্রায় সর্বশেষ সংযোজিত ওমিক্রন, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক আঁটোসাঁটো উদীয়মান বাজারসমূহে বেশ বড় রকমের ঝাঁকুনিই দিচ্ছে। কিন্তু এটি অস্বীকার করার জো নেই যে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য উঠতি বাজারগুলোর বেলায় এড়িয়ে বিষয়টি শুধু ঝুঁকিপূর্ণই না, ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে পরিহারের ক্ষেত্রে এখানে শুধুমাত্র চলমান মহামারিই নয়, আরো কিছু বিষয় কাজ করছে নিয়ামক শক্তিরূপে।

মানবাধিকার ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তিত মানুষদের পক্ষে উদীয়মান অর্থ ঢালা বা বিনিয়োগ করাটা সবসময়ই বিপদ-আপদের আশঙ্কাযুক্ত। তবে সে সব স্হানে বিনিয়োগ না করাটা তুলনামূলকভাবে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। এ সহজ বিষয়টি বোঝার জন্যে একেবারে অর্থনৈতিক বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; কিঞ্চিৎ অর্থনৈতিক জ্ঞান থাকা লোকেরাও একটু মাথা খাটালেই তা হূদয়াঙ্গম করতে পারে। অর্থনীতিতে বহুলালোচিত ‘উদীয়মান বাজার’ টার্মটি অসাধারণভাবে অস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মানতে কোনো দ্বিধা নেই যে, এই শ্রেণিটির আকার সুবিশাল। বিশ্বেও সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের সাতটিই আছে এ তালিকায়, আর সেগুলো হচ্ছে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও মেক্সিকো। দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান, তুরস্ক ও পোল্যান্ডের মতো অর্থনৈতিক ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নামও শোভা পায় এ তালিকায়। বিনিয়োগকারীদের বেলায় এদেরকে পরিহার করার মানেটা দাঁড়াচ্ছে বৃহত্তর প্রবৃদ্ধি এবং নিশ্চিতভাবেই অধিকতর বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাকে সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে কাজে না লাগানোর সুনিশ্চিত প্রচেষ্টা। ভ্যানগার্ড ও মর্গান স্ট্যানলিসহ অসংখ্য গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, উঠতি বাজারগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর স্টক রিটার্ন প্রলম্বিত সময়ের বেশির ভাগ জুড়ে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলে না।

উদীয়মান বাজারগুলোর তাত্ক্ষণিক ঘাটতি তাদের দীর্ঘমেয়াদি শক্তির চেয়ে অধিক প্রকট সমস্যারূপে দেখা দিতে পারে। গ্রহের এত বিশাল একটা এলাকা সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ। কিন্তু এর অধিকাংশ অংশেই করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি মুদ্রা নীতির আঁটোসাঁটোকরণ, রাজনৈতিক দুর্দশা ও জলবায়ু পরিস্হিতি একটি ধনী দেশের চেয়ে অধিক জরুরি ভিত্তিতে হুমকি দিচ্ছে। ঐ সব দেশের স্টক মার্কেটের দর সাধারণভাবে পড়ে গেছে, অথচ মার্কিন স্টক মার্কেটে ঘটেছে ঠিক তার উলটোটা। ওয়াল স্ট্রিটের ভেতরের এবং বাইরের বিশেষজ্ঞরা জোট বেঁধে একই ধরনের ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করছিলেন কমসে কম আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত।

এখানে একটা সমস্যা হচ্ছে, পশ্চিমা ব্যাংকগুলো অধিক সুরক্ষিত মুদ্রানীতির দিকে ফেরত যাচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে সম্পদকে উদীয়মান বাজারসমূহের বাইরে নিয়ে যায়। এতে করে তাদের অর্থনীতি বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে-আর এসব কথা বলছিলেন কমনওয়েলথ ফিন্যান্সিয়াল নেটওয়ার্কেও বৈশ্বিক বিনিয়োগ কৌশলী আনু গাগ্গার। অতিসম্প্রতি দ্য ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে এই প্রথম স্বল্পমেয়াদি সুদের মাপকাঠি বৃদ্ধি করে। এর ঠিক আগের দিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক জানায়, তারা কার্যকরভাবেই সুদের হার বৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং যেটি সত্যিকার অর্থেই এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চতর সুদের হারের অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়বে। এর ফলে অনেক উঠতি বাজার সঙ্গত কারণেই সমান্তরাল ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। এমন দেশগুলোর মধ্যে আছে ব্রাজিল, চিলি, মেক্সিকো, রাশিয়া, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র। এরা এরই মধ্যে সুদের হার বৃদ্ধি শুরু করে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত। ফেডারেল ব্যাংকের ঘোষণার আগে জাপানি আর্থিক জায়ান্ট গ্লোবাল ম্যাক্রো রিসার্চ ফর নোমুরার প্রধান রবার্ট সুব্রানিয়াম জানিয়েছিলেন উদীয়মান বাজারগুলোর গ্রুপ এই মুহূর্তে চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে। তিনি একটি গবেষণায় টেলিফোন সাক্ষাত্কারে সরাসরিই বলেন, ‘আগামী ছয় মাস কিংবা এর কিছু বেশি সময়ের জন্যে আমি বিনিয়োগকারীদের খুব বেশি সতর্ক থাকার আহ্বান জানাব’। তিনি এমন একটি গ্রুপের সম্ভাব্য মহাবিপদ সম্পর্কে আঁচ করে সতর্ক করে দিয়েছেন, যেটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘দ্য ট্রাবলড টেন’। এ দলের সদস্যরা হচ্ছে ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন। এদের প্রত্যেকটিই দুরারোগ্য দুর্বল প্রবৃদ্ধি মোকাবিলা করছে। বর্ধিষ্ণু মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন তাদেরকে গভীর আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছে। যেখান থেকে বের হয়ে আসার উপায় বের করতে গিয়েই তারা খাবি খাচ্ছে।

—দ্য বিজনেস টাইমস অনুসর‌ে

ইত্তেফাক/কেকে