রাজধানীর বনানীতে গত মার্চ মাসে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ইহাতে নিহত হন অন্তত ২৬ জন। সেই সময় এই ভবনটি পরিদর্শন করিতে গিয়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এই অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন। অবহেলা, উদাসীনতা ও নিয়ম না মানিবার কারণেই একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটিতেছে। চকবাজারের চুরিহাট্টা হইতে বনানীর দুর্ঘটনা সবখানে আমাদের দায়িত্বহীনতাই দায়ী। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের প্রেক্ষিতে রাজধানীর বহুতল ভবনগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই-বাছাই করিবার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাজউকের ২৪টি টিম দুই সপ্তাহ ধরিয়া ২০০টির মতো বহুতল বাণিজ্যিক ভবন পরিদর্শন করেন। ইহার পর তাহারা সরকারের নিকট একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিছুদিন আগে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বলিয়াছেন যে, পরিদর্শনকৃত ভবনগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাণ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় নানা অনিয়ম ও অসংগতি খুঁজিয়া পাওয়া গিয়াছে। ইহা কি সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের চরম ব্যর্থতা নহে?
বহুতল ভবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করিয়া ভবনগুলিকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হইয়াছে। এক. অনুমোদন ছাড়া নির্মিত বহুতল ভবন; দুই. অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নাই এমন ভবন ও তিন. অন্যান্য নিরাপত্তার ব্যাপারে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। ইহাতে দেখা যায়, কোনো কোনো ভবনে জরুরি বাহির হইবার রাস্তা নাই। কোনো কোনো ভবনে গাড়ি রাখিবার গ্যারেজের জায়গাটা বন্ধ করিয়া অবৈধভাবে গড়িয়া তোলা হইয়াছে নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। ১০ তলার ঊর্ধ্বে বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে নকশা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু নির্মাণকালে অনেক সময় এই নকশা অনুসরণ করা হয় না। মানা হয় না বিল্ডিং কোড। ইহার কারণেও ভবনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। দমকল বাহিনীর মতে, ঢাকা মহানগরীর ৯৫% হইতে ৯৬% বাণিজ্যিক ভবন অগ্নিনিরাপত্তাগত ঝুঁকিতে রহিয়াছে। প্রশ্ন হইল, রাজউকের পরিদর্শকের পরিদর্শন ব্যতীত কোনো ভবন নির্মাণ হয় না, তাহা হইলে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেওয়া কেন বাধ্যতামূলক হইবে না? মূল নকশা পরিবর্তন করিয়া ১৮তলা ভবনকে কীভাবে ২৩ তলা বানানো হইল? উপযুক্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে বড় বড় ভবনে শত শত মানুষকে কাজ করিবার সুযোগ দেওয়া হইতেছে? বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কমপ্লায়েন্সগুলি নিশ্চিত করিবার জন্য শুধু নোটিস দিলেই চলিবে না, তাহা বাস্তবে কার্যকরও করিতে হইবে।
আমরা জানি, যে কোনো ভবনের নকশা দমকল বাহিনী হইতে শুরু করিয়া নয়টা বিভাগের অনুমোদনের পর রাজউক হইতে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এখন এইসব নিয়মের চর্চা ও অনুশীলন বাড়ানো প্রয়োজন। নকশা নেওয়ার পর ভবনটি সেই অনুযায়ী হইতেছে কি না অথবা পরে ভিতরে কোনো পরিবর্তন সাধন করা হইতেছে কি না— তাহা তদারকি করা দরকার। দায়িত্ব অবহেলার জন্য কোনো মানুষের মৃত্যুতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হইতে শুরু করিয়া ভবন মালিক, ডেভেলপার যাহারাই দায়ী হউন না কেন, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হইবে। বহুতল ভবনগুলি তদারকির জন্য প্রয়োজনে বাড়াইতে হইবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জনবল।
