ড. মুহম্মদ মনিরুল হক
সহিংসতা হচ্ছে এমন এক ধরনের আচরণ, যার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত বা হত্যা করা। সহিংসতার শিকার নারী বা পুরুষ উভয়ই যেমন হতে পারে, তেমনি নারী-পুরুষ বা উভয়ের দ্বারা সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। নারী-সহিংসতার অন্যতম দিক হচ্ছে যৌন হয়রানি বা যৌন নিপীড়ন। জাতিসংঘের ঘোষণা ১৯৯৩ অনুযায়ী নারী-সহিংসতা হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন আচরণ, যা নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করে। নারী ও শিশুকে প্রথাগত নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতার হার ম্লান। নারী নির্যাতনের কারণে বছরে মোট জিডিপির ২.১৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। সর্বশেষ বিবিএস জরিপ অনুসারে ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ নারীই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নারী সহিংসতার শিকার হয় মূলত পরিবারের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে স্বামীর দ্বারা।
এটাও ঠিক যে, নারী অধিকার ও উন্নয়নে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের রোল মডেল। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও সুযোগের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নেও সমান অবদানকারী হিসেবে নারীর মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১-এ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল ধারায় নারীর পূর্ণ ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিতকরাসহ নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও আইনগত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জেন্ডার ও বাজেট প্রতিবেদন ২০১৮-২০১৯ -এ বর্ণিত তথ্যানুযায়ী নারী উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার প্রতিবছর গড়ে জিডিপির প্রায় ৫.০ শতাংশ ব্যয় করছে। নারী ও কন্যাশিশুর উপর নির্যাতন রোধকল্পে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এবং জাতীয় মহিলা সংস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল গঠন করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য খরচ বহনে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে জেলা ও সেশন জজের অধীনে নির্যাতিত নারীদের জন্য তহবিল গঠিত হয়েছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও নারী উন্নয়নের চিত্র সাফল্যজনক। কেননা, ২০১৭ সালে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ৪৬.২:৫৩.৮ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অনুপাত ৫১:৪৯-এ দাঁড়িয়েছে, যা জেন্ডার সমতা বিধানের কাছাকাছি। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগে বাংলাদেশের অবস্থান একনম্বরে। নতুন নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বের বিকাশমান দেশগুলোর ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের লিঙ্গবৈষম্য বিষয়ক প্রতিবেদন ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৭’ অনুসারে, লিঙ্গবৈষম্য দূর করার প্রতিযোগিতায় ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে অনেক পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ১৪৪টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। প্রাথমিক স্তর ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির সূচকে বাংলাদেশ এক নম্বরে। ছেলে ও মেয়ে শিশুর জন্ম অনুপাতেও বাংলাদেশ একনম্বরে। গত ৫০ বছরে নারী সরকার প্রধানের সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান একনম্বরে। নারী উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশে জাতিসংঘের ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে। বাংলাদেশের কয়েকটি সেক্টরে নারীর অগ্রগতিকে রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘ।
পৃথিবীতে শুধু নারীই শোষিত নয়, পুরুষও এখনো শৃঙ্খলিত ও শোষিত। তবে শোষিত-শৃঙ্খলিত নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য; সব শ্রেণির পুরুষ বন্দি ও শোষিত নয়, কিন্তু সব শ্রেণির নারীই বন্দি ও শোষিত। কারণ নারী হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিনির্মাণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা ও নারীর নিপীড়নকে বৈধতা দেয়া। নারীবাদী তাত্ত্বিকদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত যেহারে পুরুষ কর্তৃক নারীরা নির্যাতিত হয়েছে, সে হারে নারীরা যদি পুরুষকে নির্যাতন করে তাহলেও কোনোদিন তার সমান হবে না। ইতিহাস বিশ্লেষণেও দেখা যায়, সমাজ-রাষ্ট্রকে নেতৃত্বদানকারীর ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস। অথচ বিগত শতকের ৭০ দশক থেকে নারীর অবস্থান পরিবর্তনে যে সকল সমাজবিজ্ঞানী ও নারীবাদী সোচ্চার হয়েছেন তাদের অনেকেই ছিলেন পুরুষ।
সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও উন্নয়নের বিভিন্ন স্তরে প্রাগৈতিহাসিক চিন্তা-কর্মের পুনঃপুন মঞ্চায়নও পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতাকে বার বার জানিয়ে দেয়, নিগৃহীত-নির্যাতিত নারীর কথা-পুরুষতান্ত্রিক বর্বরতার ইতিহাস। তাই প্রশ্ন জাগে, জেন্ডার নিরপেক্ষ বা নারী অধিকার ও বাস্তবায়নের অগ্রণী ভূমিকার মানবিক পুরুষরাও কী জেন্ডার বৈষম্যহীন সভ্যতার স্কিনশট মাত্র? বাস্তবে তা সত্য নয়, সেটা প্রস্ফুটিত করার জন্যেই জেন্ডার বৈষম্যহীন মানবিক পুরুষের অধিক দায়বদ্ধতা বার বার আসে।
n লেখক: জেন্ডার, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন গবেষক
