মোহাম্মদ আবদুল কাদের
আমাদের সমাজ যখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভাসছে, তখন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ। হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা আর মনুষ্যত্ব। কমছে সম্মান আর স্নেহ। কমছে গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি। বলা যায়, শিষ্টাচারের স্থানটি লোপ পাচ্ছে সমাজ থেকে। আজকের সমাজে শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা যেন সোনার হরিণ। আর এর জন্য অনেকটাই দায়ী বড়রা। একটা শিশু বেড়ে ওঠার সময় সে সমাজ ও পরিবারে যা দেখবে তা-ই গ্রহণ করবে। আমার সন্তান খারাপ হতে থাকলে ভাবতে হবে আমারও কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তা না করে আমরা সন্তানের ওপরই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিচ্ছি। আমি গালি দিলে আমার সন্তান সেটা কেন শিখবে না? তাই বড়রা ঠিক থাকলে ছোটরাও ঠিক থাকবে।
স্কুল-কলেজে শিক্ষকরা ক্লাসে এলে দাঁড়িয়ে যাওয়াটা নিয়ম মনে করেই ছাত্ররা দাঁড়ায়। বাস্তবে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে দাঁড়ানোর মানসিকতা প্রায় ছাত্রদের ভেতর এখন আর জাগ্রত নেই। দেখা যায়, চলার পথে শিক্ষাগুরু বা বড়দের দেখে ছাত্ররা সালাম তো দেয়ই না বরং পাশ কাটিয়ে সাইকেল বা মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে যায়। শিক্ষাটা যে পরিবার থেকে আসবে তা নয়। সেটা আসতে পারে সমাজ থেকে, স্কুল থেকে, বড় ভাই থেকে, বন্ধু থেকে, কর্মস্থল থেকে কিংবা কোনো সংগঠন থেকে। কিন্তু বাস্তবে সমাজ, পরিবার, স্কুল-কলেজ, বন্ধুবান্ধব, বড়ভাই কিংবা সংগঠন কোথাও যেন এই শিক্ষা নেই!
এখন ছোটদেরও বড়দের ওপর আঘাত করতে দেখা যায়। যার ভেতর শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধের অভাব থাকবে সে তো বড়দের আঘাত করবেই। আর এর দায় বড়দেরই নিতে হবে। আজকাল বড়োরাই ছোটদের এই শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও ভদ্রতা থেকে দূরে রাখছে। তারাই ছোটদের নিয়ে অন্যায়পথে হাঁটছে। এ থেকে ছোটরা কী শিখবে? আপনি যদি আপনার বড়কে সম্মান না দেন, তাহলে আপনাকে আপনার ছোটজন কিভাবে সম্মান দেবে? আর আপনিই বা সেই সম্মান কিভাবে আশা করেন? তাই সচেতন হতে হবে আপনাকে আমাকে এখন থেকেই। যার যার অবস্থান থেকে মানবিকতা, নৈতিকতা, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও সৌজন্য প্রদর্শন এবং ভালো ব্যবহার করতে হবে। তবেই অন্যজন শিখবে। আমি অন্যজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে তার বিনিময়ে আমিও ভালো ব্যবহার পাব। তাই আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে, তার পর অন্যজনকে সচেতন করার কথা ভাবতে হবে। আমি অন্যায় কাজ করি, আর মানুষকে বড় বড় লেকচার দেই—সেটা তো হতে পারে না। আমি কেমন সেটা কাজে প্রমাণ করাটাই আসল বিষয়।
তাই আসুন আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থানে থেকে সচেতন হই। এর ফলে একদিন দেশ হয়ে উঠবে ভালোবাসায় ভরপুর। সমাজ হবে শান্তিময়; শিষ্টাচার ও নৈতিকতায় পূর্ণ। নিজেদের ভেতর সেই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ছোটদের স্নেহ আর বড়দের সম্মান দিয়ে আগে নিজেরা নিজেদের ঠিক করি। আত্মসমালোচনা করে সংশোধনের চেষ্টা করি। তখন আমার কাছ থেকে বড় বা ছোট সবাই শিক্ষা পাবে। পরিশেষে বলতে চাই—মুখে নয়, কাজে শিষ্টাচারের প্রমাণ দিতে হবে।
কুমিল্লা
