মনে করেছিলাম, বাংলাদেশ বিমান অথবা সিভিল অ্যাভিয়েশন বিভাগ নিয়ে আর কোনো লেখা লিখব না। তারপর দেখলাম, কক্সবাজার বিমানবন্দর নিয়ে কিছু না লিখলেই নয়।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, কক্সবাজারকে তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবেন। এটা অবশ্যই তার দূরদর্শিতার একটি উত্কৃষ্ট প্রমাণ।
আমি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি। কতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছি তার হিসাব করাও কঠিন। আমার স্ত্রীও অনেক দেশ ভ্রমণ করেছে। তবে মাস দুয়েক আগে আমার ছোট মেয়ে ও তার দুই কাজিনকে নিয়ে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের জাফলং, হবিগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি স্হান বেড়িয়ে এলো। ঢাকায় ফিরে এসে সে আমাকে বলল, ইউরোপ বা অন্য দেশে ভ্রমণে আমি এতটা আনন্দ লাভ করিনি, যতটা সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করে পেয়েছি! আরো বলল, আমাদের দেশে এত এত সুন্দর জায়গা থাকতে অনেক অর্থ খরচ করে লোকজন কেন বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছে?
তাজমহল, সূর্যমন্দির, অজন্তা, ইলোরা— এগুলো তো থাইল্যান্ডে নেই, তার পরও ভারতের চেয়ে থাইল্যান্ডে বেশি বিদেশি পর্যটক যায়। থাইল্যান্ডের মানুষের সৌন্দর্যবোধ আছে। তারা জানে নিজেদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেমন করে আরো বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত করে বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষিতভাবে উপস্হাপন করা যায়।
আমাদের কক্সবাজারে পৃথিবীর দীর্ঘতম দৈর্ঘে্যর সমুদ্রসৈকত আছে। সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ আছে। এসবও থাইল্যান্ডে নেই। তার পরেও আমাদের দেশে না এসে এত পর্যটক কেন অন্য দেশগুলিতে যায়? এর কারণ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
বিদেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটকেরা আসতে চায় না। এর বড় কারণ, আমাদের দেশে বিনোদনের কোনো ব্যবস্হা নেই। বিদেশ থেকে বাংলাদেশে যাতে পর্যটকেরা আমাদের দেশে না আসে, সেসবের ব্যবস্হা আমাদের সমাজব্যবস্হায় আছে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সব বিনোদনের ব্যবস্হা নিয়ে যেসব বিশ্বাস, বিদেশিরা ওসব বিশ্বাস করতে চায় না। তাই কক্সবাজারকে আমরা যতই সুন্দর করে তুলি না কেন, এর অর্থ এই নয় যে, বিশাল এবং বড় বড় উড়োজাহাজে ভর্তি হয়ে বিদেশি পর্যটকেরা কক্সবাজার বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করবে! কিন্তু বিদেশিরা না আসুক, আমরা তো দেশি পর্যটকেরা আছি! দেশি পর্যটকেরা তো সংখ্যায় কম না! আমরা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশে না গিয়ে দেশের ভেতরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যদি আনন্দভ্রমণ করি, তবে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে। দেশের টাকা দেশেই থাকবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দোকানপাট তৈরি হয়ে দেশীয় পণ্য বিক্রি হবে। আমাদের অর্থনীতি আরো সম্প্রসারিত হবে। তবে পর্যটনকেন্দ্রের উন্নতির জন্য প্রাথমিকভাবে আমাদের সরকারকেই অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যখন বুঝতে পারবে এখাতে মুনাফার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে, তখন তারাই উত্সাহিত হয়ে পর্যটনকেন্দ্রে বিনিয়োগের হাত বাড়িয়ে দেবে। ফলে আমাদের বেকার যুবকদের কর্মস্হানেরও ব্যবস্হা হবে।
আমি ২০১১ সালে একটি পত্রিকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নামের ভবনটি নির্মাণের কথা লিখেছিলাম। আরো লিখেছিলাম, শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি রানওয়ে আছে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন আরো একটি রানওয়ে নির্মাণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ভবনগুলো ওখান থেকে সরিয়ে নেওয়া অথবা ভেঙে ফেলা। শাহজালাল বিমানবন্দরে কীভাবে দ্বিতীয় রানওয়ে করা যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত লিখেছিলাম।
শাহজালাল বিমানবন্দরে দুটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তাতে অনেকখানি স্হানের প্রয়োজন হয়েছে। আমি অবশ্যই মসজিদ নির্মাণ করার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু প্রতিটি টার্মিনাল ভবনের ভেতরে একটি করে নামাজ পড়ার ঘর কি করা যায় না? দুবাই বিমানবন্দরে দেখেছি, প্রতিটা টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে একটি করে নামাজ পড়ার ঘর আছে। এমনকি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্িরষ্টান বা অন্য ধর্মালম্বীদের জন্য প্রার্থনা করার ঘরও আছে।
বিমানবন্দর থেকে উত্তরা হয়ে টঙ্গির দিকে যে রাস্তা গিয়েছে, সেই রাস্তার পূর্ব দিকে বিমানবন্দর বা সিভিল অ্যাভিয়েশন বিভাগের অনেক জায়গা আছে। সেখানে আছে র্যাবের একটি ক্যাম্প, একটি স্কুল, চিকিত্সাসেবা কেন্দ্রসহ বিমান স্টাফদের কোয়ার্টার। পাঠক, আপনি কি শুনেছেন বা দেখেছেন, কোথায়ও বিমানবন্দরের জায়গায় স্কুল, স্টাফ কোয়ার্টার থাকার কথা! ওখানে একটা খোলা মাঠও অব্যবহূত অবস্হায় আছে।
করাচি, দিল্লি, কলকাতা ৭০-৮০ বছর আগে যেখানে ছিল, বর্তমানেও সেখানেই আছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের যে আয়তন, ওসব বিমানবন্দরের আয়তন তার চেয়ে কম। আমার কথা হলো, বিমানবন্দর থেকে টঙ্গীগামী রাস্তার নিচ দিয়ে সুদৃশ্য ও চওড়া টানেল বানিয়ে রাস্তার পূর্ব পাশের জায়গার সদ্ব্যবহার করা উচিত। বিমানের ট্রেনিং স্কুল, ভিভিআইপি নয়, ভিআইপিদের গাড়ির পার্কিং এলাকা, সাধারণের পার্কিং—সবকিছু রাস্তার পূর্ব দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
শাহজালাল বিমানবন্দরে এতটা স্হান থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন ১ লাখ কোটি টাকা (এটা ছিল প্রাথমিক হিসাব, পরবর্তীকালে বৃদ্ধি পেয়ে এটা হতো ২ লাখ কোটি) খরচ করে আড়িয়াল বিলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করতে যাব?
অন্য কথায় যাওয়ার আগে জাতীয় পার্টির বর্তমান প্রধান জি এম কাদের প্রসঙ্গে দুটি কথা বলে নিতে হচ্ছে।
জি এম কাদেরের মতো সত্ মানুষের দেখা আজ পর্যন্ত আমি কমই পেয়েছি। তিনি আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি নিজে একজন ইঞ্জিনিয়ার। বিল ভরাট করে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করার সমস্যার কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। এটিএন নিউজ টেলিভিশনে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমি ছিলাম। বিষয়বস্ত্ত ছিল, আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণ। প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগে আমরা টিভি চ্যানেল কেন্দ্রে গিয়ে উপস্হিত হয়েছিলাম। আমরা কী কথা বলব, সে বিষয়ে একটু আলোচনা করে নিলাম।
জি এম কাদের ভাই বলছিলেন, ‘আমি অ্যাভিয়েশন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। সরকারের নীতি সমর্থন করেই আমাকে কথা বলতে হবে। একমাত্র পদত্যাগ করেই আমি সরকারের সমালোচনা করতে পারি। তিনি আমাকে বললেন, সব সত্যি কথা আপনি অকপটে বলতে পারেন। প্রয়োজনে আমারও সমালোচনা করতে পারেন।’
রাজাকার হিসেবে সর্বজন পরিচিত এক ব্যক্তি তখন ছিলেন বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব। আওয়ামী লীগ দলটি তখন ক্ষমতায়। রাজাকার সচিব তখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকগুলো কবিতা লেখেন এবং সেই সব কবিতা দিয়ে একখানা বইও প্রকাশ করেন। সাক্ষাত্কারের জন্য কেউ গেলে ঐ কবিতার বই উপহার দিতেন। এছাড়া কলকাতার সিরিয়াল নাটকের নায়িকারা যেমন চোখে গ্লিসারিন দিয়ে কাঁদেন, তেমনি সচিব মহোদয়ও চোখে গ্লিসারিন দিয়ে রাখতেন। বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে গিয়ে তার দুচোখে শ্রাবণধারা বইতে শুরু হতো। তিনি ঘোষণা করলেন, আড়িয়ল বিলে যে বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে, তার নামকরণ করা হবে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। এই করে ২৪ ক্যারেট সোনার চেয়ে খাঁটি রাজাকার সচিব দুই-দুবার চুক্তিভিত্তিক চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। ঐ ব্যক্তিই ছিলেন আড়িয়ল বিলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের মূল পরিকল্পনাকারী। আশুগঞ্জে ছিল তার বাড়ি। তৃতীয় বারের মতো যখন তার চুক্তিভিত্তিক চাকরি বাড়ানোর জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন, তখন আশুগঞ্জের স্হানীয়রা দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার, ছবিসহ তার নাম লিখে দেশবাসীকে জানাল রাজাকার হিসেবে একাত্তর সালে তার অত্যাচারের কাহিনি। এতে কাজ হলো। তিনি আর তৃতীয় বারের মতো চুক্তির ভিত্তিতে তার চাকরির মেয়াদ বাড়াতে পারলেন না। এখন ঐ ব্যক্তি কোথায় আছেন জানি না। কিন্তু তার একাধিক পেতাত্মা বাংলাদেশেই আছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের উত্তর প্রান্েতর দিকে উত্তরা মডেল টাউনে যেসব সচিব প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন, উড়োজাহাজ ওঠানামায় সমস্যা হবে বলে তাদের প্লটে একটি বিশেষ উচ্চতার চেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণ করতে পারবেন না বলে শাহজালাল বিমানবন্দরের বিকল্প হিসেবে আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণে রাজাকার সচিবকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছিলেন। অ্যারোপ্লেনের নেভিগেশন সিস্টেমের কতটা উন্নতি হয়েছে, তা প্লটপ্রাপ্তরা অথবা রাজউক কর্মকর্তারা জানতেন না।
PBN (Performance Based Navigation), FMS (Flight Management System)— এসব আধুনিকতম প্রযুক্তির সংযোজন করার পর উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে আগের মতো দূরত্বের প্রয়োজন হয় না। প্লটপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উড়োজাহাজের নেভিগেশনের প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছ থেকে সবকিছু জেনে নিয়ে রাজউকের কর্মকর্তাদের বোঝাতে পারলে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে তাদের জন্য আর বাধা রইবে না।
ইচ্ছা ছিল কক্সবাজার বিমানবন্দর নিয়ে একটু বিস্তারিত লিখব। কিন্তু অন্য সব প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক কথা বলতে গিয়ে ঐ বিমানবন্দর নিয়ে আজ আর বিস্তারিত লেখা সম্ভব হবে না।
কক্সবাজার রানওয়ের দৈর্ঘ্য এখন ৯ হাজার ফুট। পরিকল্পনা করা হয়েছে, ঐ রানওয়ের দৈর্ঘ্য নাকি বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হবে। অমনটা করা হলে সেটা ভুল করা হবে। আমার মতে, ঐ রানওয়ে দৈর্ঘে্য ৭ হাজার ফুট হলেই যথেষ্ট হতো। এর কারণ, বিদেশ থেকে যেসব পর্যটক আসবেন, তারা ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে মাঝারি আকারের, অর্থাত্ ৪০ থেকে ৬০ জন যাত্রী বহন করতে পারে এমন উড়োজাহাজে কক্সবাজারে যাবেন। সব দেশেই এমনই ব্যবস্হা আছে।
কক্সবাজারে ভবিষ্যতে প্রতি বছর আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কয়েক লাখ পর্যটক বেড়াতে যাবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, বরিশাল, রাজশাহীসহ অনেক বিমানবন্দর থেকে দৈনিক হয়তো কক্সবাজারে ৭০-৮০টা ফ্লাইট যাওয়া-আসা করবে। ঐ সব উড়োজাহাজ পুরোপুরি জেট প্লেন না হয়ে টার্বো জেট প্লেন হলেই ভালো হবে। টার্বো জেট প্লেনে পুরোপুরি জেট প্লেনের চেয়ে জ্বালানি তেল খরচ কম হয়। অনেক দূরত্বে যাওয়ার অ্যারোপ্লেন দিয়ে কম দূরত্বের রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করাও অলাভজনক।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিএনএ ও জেনেটিক সায়েন্স অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর অনেক গুণাবলি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তাই তিনি আমাদের চেয়ে জ্ঞানী এবং মেধাবী। তবু তাকে অনুরোধ করে বলব, যারা গ্লিসারিন চোখে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম বলতে গিয়ে অশ্রুপাত করে, তাদের অবশ্যই দূরে রাখবেন। করোনা ভাইরাস থেকে যতটুকু দূরে রাখার প্রয়োজন, তার চেয়েও বিশ গুণ দূরে। তোষামোদকারীরা করোনা ভাইরাসের চেয়েও বহু গুণ বিপজ্জনক!
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বৈমানিক
