জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, আল্লাহ আমাদের যে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন তার সদ্ব্যবহার করে মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য তা কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, মানুষের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। সমস্যা আছে, সমস্যা ছিল এবং সমস্যা থাকবে। তার মধ্যেই আমাদের সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা যেখানে যেভাবে অবস্হান করি না কেন, সেখানে থেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে তত্পর হওয়া উচিত।
বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা সদরে স্হানীয় সাংবাদিক এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে পৃথক সভায় তিনি আরো বলেন, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব। তারপর যদি তাদের কর্মক্ষেত্র উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হয়, তাহলে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে যেমন রয়েছে তাদের পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, তেমনি রয়েছে স্হানীয় প্রভাবশালীদের চাপসহ নানা প্রতিবন্ধকতা। তাই স্হানীয় পর্যায়ের মানুষের সুখ-দুঃখের কথা লিখতে গিয়ে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তখন বিকল্প হিসেবে জাতীয় পর্যায় থেকে সাংবাদিকরা এসে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংবাদ সংগ্রহ করেন এবং গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করে থাকেন।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সাংবাদিকরা যখন অন্যের বিষয় লেখেন তখন অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যে কথাটি অপরের ক্ষেত্রে বলেন বা অন্যের ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরেন, তা যেন নিজেদের মধ্যে না থাকে। স্হানীয় বিভিন্ন অফিস-আদালতের কাজ বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অপচয়-আত্মসাতের যে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন, সেখানে যেন সাংবাদিকরা অনুরূপ আচরণ করে না বসেন। তিনি বলেন, এখানেই একজন সাংবাদিকের মহৎ ভূমিকা প্রকাশ পায়। সাংবাদিককে অবশ্যই যোগ্যতা-দক্ষতা-জ্ঞান ইত্যাদি অর্জন করেই কাজ করতে হয়। আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়শই নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করতে হয়। এজন্য সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা ও সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আমাদের দেশে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের চাহিদা অনুযায়ী পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক প্রদান করতে সক্ষম হয় না। সাংবাদিকদের জন্য প্রচলিত ওয়েজবোর্ডেও নানা তারতম্য রয়েছে। এ কথা জেনেই স্হানীয় পর্যায়ে সংবাদকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন। স্হানীয় পর্যায়ের দায়িত্বপালনকারী সাংবাদিকদের এ ক্ষেত্রে অনেকটা স্বেচ্ছাসেবী কর্মীর মতো কাজ করতে হয়, যা একধরনের সমাজকর্মের সঙ্গে তুলনীয়।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, সংবাদকর্মীদের যেমন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়, তেমনি প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা যখন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে উপদেশ দেন তখন বলা হয়, সব বিষয়ই লিখবেন, তবে আমাদের বিরুদ্ধে না লেখাই কাম্য। এতসব বাস্তবতার মধ্যেই সাংবাদিকদের কাজ করে যেতে হবে। দেশ-বিদেশে যারা সংবাদপত্রের মালিক হন তারা হয় শিল্পপতি, না হয় পুঁজিপতি। তাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েই গণমাধ্যম তার দায়িত্ব পালন করে। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে বজায় রেখে সঠিক সাংবাদিকতা করা গেলে তা হবে যথার্থ দায়িত্ব পালন। আমাদের আর্থসামাজিক অবস্হায় তাই ভারসাম্য রক্ষা করে সাংবাদিকরা কাজ করেন বলেই তা একটি চ্যালেঞ্জিং ও মহান পেশা হিসেবে পরিগণিত।
পিরোজপুর-২ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, এই উপজেলায় অতীতে এমন দুই-একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন যারা পার্থিব চাহিদার বদলে পারলৌকিক শান্তির বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। আমরা সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ না করেও বলতে চাই, মানুষকে জীবনধারণের জন্য নানা অবকাঠামোগত সুবিধা রাষ্ট্র থেকে প্রদান করা হয়। এর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, দুর্যোগ প্রতিরোধ—এসব সুযোগপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক চাহিদা। যার জন্য আমরা সব সময় চেষ্টারত ছিলাম, ভবিষ্যতেও এসব ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। তাই এলাকার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থেকে তার প্রাপ্য ও হিস্যা আদায় করতে হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বৃহস্পতিবার ইন্দুরকানী প্রেসক্লাবের নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। প্রেসক্লাবের সভাপতি আজাদ হোসেন বাচ্চুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বিশেষ অতিথি পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ, ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুত্ফুন্নেছা বেগম, দৈনিক ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার ও পিরোজপুর অফিস প্রধান মুনিরুজ্জামান নাসিম আলী এবং ইন্দুরকানী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এইচ এম ফারুক হোসাইন ও সাবেক সভাপতি আহসানুল হক সগীর।
এরপর ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সরকারব্যবস্হায় স্হানীয় পর্যায়ের ধাপ হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। এখানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। তাদের জনগণের কথা শুনে মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে অভাব-অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হয়। তারা স্হানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজের তদারকি ও বাস্তবায়নের মহান দায়িত্ব পালনেও সক্রিয় থাকেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন বলে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করাও তাদের দায়িত্ব।
ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুত্ফুন্নেছা বেগমের সভাপতিত্বে এ মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন—পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ, ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান, বালিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন বয়াতি, পত্তাশী ইউপি চেয়ারম্যান মো. শাহীন হাওলাদার, চণ্ডীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জু, পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান তালুকদার শাওন, ইন্দুরকানী ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদ করিম তালুকদার ইমন, পাড়েরহাট ইউপি সদস্য আসমা আক্তার ও পত্তাশী ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম। এ সময় উপস্হিত ছিলেন—ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এনামুল হক, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাঘা, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান দিলরুবা মিলন প্রমুখ।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি তার নির্বাচিত এলাকাভুক্ত ইন্দুরকানী উপজেলায় বৃহস্পতিবার রাতে আরো যেসব কর্মসূচিতে অংশ নেন সেগুলো হলো—ইন্দুরকানী বাজারে ইউনিয়ন পরিষদ অফিস থেকে রামচন্দ্রপুর হাট সড়কের ৪৪ মিটার দৈর্ঘে্যর আরসিসি গার্ডার ব্রিজ উদ্বোধন, কালাইয়া বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গাবগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন, উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে সংসদ সদস্যের অনুকূলে প্রাপ্ত ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ এবং সম্প্রতি উপজেলার বালিপাড়া বাজারে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঢেউটিন বিতরণ।
ইন্দুরকানী সফরকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা জেপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, সদস্যসচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুগ্ম-আহ্বায়ক মজিবুর রহমান চৌধুরী, জেপি নেতা ইউসুফ আলী আকন, পিরোজপুর জেলা পরিষদের সদস্য রেজাউল হক রেজভী জোমাদ্দার প্রমুখ।
