মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে গ্রাহকদের সঞ্চিত প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নিউ সমিতি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে সমিতির অন্তত দেড় হাজার গ্রাহক পড়েছেন চরম বিপাকে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ লোকজন ওই সমিতির নির্বাহী পরিচালক শাহিনুর ইসলাম দরজীর বাড়ি ঘেরাও করে। গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সমিতির নির্বাহী পরিচালক শাহিনুর ইসলাম দরজী ও সহযোগী সাইদুর রহমানকে আটক করেছে দৌলতপুর থানা পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলার ভররা গ্রামে অবস্থিত নিউ সমিতি নামক এই প্রতিষ্ঠানের কোনো নিবন্ধন নেই। নেই সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের কোনো অনুমতিপত্র। তারা বেশ কয়েক বছর ধরেই নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় দাদন ব্যবসা আর চড়া সুদের ব্যবসা করে আসছিল। এসব কর্মকাণ্ডের মদদদাতা এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি মাসচুক্তিতে মোটা অঙ্কের বখরা নিতেন তাদের কাছ থেকে।
দৌলতপুর উপজেলার ভররা গ্রামে প্রভাবশালী মহলটি গড়ে তুলেছে তাদের এই সুদ ব্যবসার সাম্রাজ্য। আর তাদের সুদ বাণিজ্যে সহজ সরল গ্রামবাসী সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। লাখ লাখ টাকা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে নিউ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম দরজী, তার মামা কোষাধ্যক্ষ সাইদুর রহমান, ম্যানেজার আব্বাস আলী, সহযোগী হূদয় এবং আওয়ামী লীগের সেই নেতাসহ আরো অনেকে। তাদের পাল্লায় পড়ে সমিতির কয়েক সহস্রাধিক সদস্য ও তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
প্রতারণার শিকার সমিতির সদস্যগণ গত মঙ্গলবার ভররা গ্রামে নিউ সমিতির নির্বাহী পরিচালক শাহিনুর ইসলাম দরজী ও সহযোগী সাইদুর রহমানের বাড়ি ঘেরাও করে। পরে দৌলতপুর থানা পুলিশ খবর পেয়ে দুই প্রতারককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। শাহিনুর ইসলাম দরজী ভররা গ্রামের আরজত আলীর ছেলে ও সাইদুর রহমান একই গ্রামের আতোয়ার রহমানের ছেলে। তাদের সহযোগীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। প্রতারণার শিকার ভররা গ্রামের জুলু মল্লিকের ছেলে জামাল মল্লিক জানান, প্রতি মাসে এক লাখে ৬০-৮০ হাজার টাকা সুদ দেবে, এই লোভে পরে আমি ভররা নিউ সমিতির সদস্য হই। প্রথমে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জমা করি । পরে আমার ভাইদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ পর্যায়ক্রমে ১১ লাখ ৮০ টাকা জমা করি। আমি এখন পর্যন্ত কোনো সুদের টাকা পাইনি। আমার মতো শত শত মানুষ প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
গ্রামের আব্দুস ছালামের ছেলে আলতাফ হোসেন জানান, আমার বাড়ির পাশের একজন নিউ সমিতির সদস্য হয়ে এক লাখে মাসে ৫০ হাজার টাকা লাভ পেয়েছে। আমিও তার কথা শুনে সমিতিতে ভর্তি হয়ে প্রথমে এক লাখ জমা করি। পরে পর্যায়ক্রমে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জমা করি। গ্রামের আমোদ আলীর মেয়ে নাসিমা বেগম জানান, আমি চলতি মাসে উচ্চ সুদের আশায় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে ভররা নিউ সমিতিতে ৪ লাখ টাকা জমা দিয়েছি । এ ভাবে ভররা ও আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে শত শত মানুষ ঐ সমিতিতে কোটি কোটি টাকা জমা করেন। আসল ও সুদের টাকা নিয়ে গড়িমশি করলে সদস্যরা সবাই মিলিত হয়ে শাহিনুর ইসলাম দরজীর বাড়ি ঘেরাও করে। আটক ভররা নিউ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম দরজী ও সহযোগী সাইদুর রহমান জানান, ১৬/১৭ মাস আগে ভররা নিউ সমিতি নাম দিয়ে একটি এনজিও করি। প্রায় ৫০ জন সদস্য নিয়ে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সদস্যদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে এক সদস্যের টাকা অন্য সদস্যকে সুদের টাকা হিসেবে দিতাম। সদস্যদের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল। কিছু টাকা সদস্যদের ফেরত্ দেওয়া হয়েছে।
দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুনীল কুমার কর্মকার জানান, ভররা গ্রামে নিউ সমিতির নির্বাহী পরিচালক শাহিনুর ইসলাম দরজী ও সাইদুর রহমানকে সমিতির সদস্যরা পাওনা টাকার দাবিতে বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রেখেছে বলে খবর পাই। পরে সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার সমিতির সদস্যদের অভিযোগ শুনে প্রতারক দুইজনকে তাত্ক্ষণিকভাবে আটক করা হয়। প্রতারণার শিকার ভররা গ্রামের জুলু মল্লিকের ছেলে জামাল মল্লিক বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
