মা বলেছিলেন জিতে এসো, হেরে যেয়ো না 

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২২, ১২:০৬

‘অনেকটাই সচ্ছল পরিবারের সন্তান আমি। পড়েছি ইংরেজি মাধ্যমে। যখন স্বাধীনতাযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন পরিবারের কেউই খুব একটা বাধা দেয়নি। আমার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। নরসিংদী থেকে আমার যাত্রা শুরুর দিন পরিবারের কাছ থেকে যখন বিদায় নিই, তখন মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, জিতে এসো, হেরে যেয়ো না। তোমাকে দেশের জন্য ছেড়ে দিলাম। মা তখন ধরেই নিয়েছিলেন, আমি আর ফিরব না। বাবা নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নরসিংদী লঞ্চঘাটে নামিয়ে দিয়ে এলেন। জড়িয়ে ধরে বিদায় জানালেন। তখন আমার চোখেও পানি এসে গেল।’ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেন স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) বদরুল আলম বীর উত্তম। ২০১৬ সালে তিনি স্বাধীনতা পদকও পেয়েছেন।

ইত্তেফাককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলম বলছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর সূর্য ওঠার অনেক আগেই অন্ধকারের মধ্যে ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা ডিমাপুর থেকে একটি হেলিকপ্টার নিয়ে  উড্ডয়ন করলাম। সেটি আমি চালাচ্ছিলাম। সঙ্গে ছিলেন সুলতান মাহমুদ (বীর-উত্তম) ও সাহাবউদ্দিন আহমেদ (বীর-উত্তম)। আমাদের সঙ্গে আরো দুজন ছিলেন। তারা অপারেটর। হেলিকপ্টারটি ছোট আকৃতির। নাম অ্যালুয়েট। এতে ছিল ১৪টি রকেট ও একটি মেশিনগান। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা। হেলিকপ্টারটির অন্ধকারে ওড়ার ক্ষমতা ছিল না। তার পরও ঝুঁঁকি নিয়ে অপারেশনে রওনা হলাম। আমাদের লক্ষ্য, ফতুল্লার তেলের ডিপো। এই ডিপো থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্হল, নৌ ও আকাশযানগুলোর জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। ভারতের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পাকিস্তানি সেনারা এখানে মজুত রেখেছিল বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল। মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা অনেক চেষ্টা করেও এই ডিপোর ক্ষতিসাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কারণ, এর নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অনেক শক্তিশালী। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে তেলের ট্যাংকারের ওপর একের পর এক বোমা নিক্ষেপ করি। মুহূর্তের মধ্যে ট্যাংকারগুলো একের পর এক বিস্ফোরিত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা উঠে যায় আকাশে। অপারেশন শেষে আমরা ডিমাপুর ফিরে যাই।’

বদরুল আলম পাকিস্তানি বিমানবাহিনীতে ছিলেন। তার পদবি ছিল ফ্লাইং অফিসার। ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্র‚য়ারি পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের সারগোদা বিমানঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। নিজের ইচ্ছায় বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় ফিরে রিপোর্ট করলেও তাকে চাকরিতে যোগ দিতে দেওয়া হচ্ছিল না। এর মধ্যে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে।

স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) বদরুল আলম বীর উত্তম

খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘পরদিন সকালে আমি বাড়ি থেকে বের হলাম, পড়ে থাকা লাশ দেখে অনেক কষ্ট পাই। তখনই মনে মনে কিছু একটা ভাবতে থাকি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে একদিন আবারও জয়েন করতে ক্যান্টনমেন্টের দিকে গাড়িতে করে যাচ্ছি, পথের মধ্যে উইং কমান্ডার সদরুলের সঙ্গে দেখা। তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানালেন। পরদিন ফ্লাইট লে. মতিউরের বাসায় যেতে বললেন তিনি। পরদিন আমি সেখানে গেলে বাসা থেকে সবাই একে একে পালিয়ে যান। তখনো আমি বিষয়টা বুঝতে পারিনি। পরে সদরুল সাহেবের কাছ থেকে জানলাম, আমি তো অনেক ফরসা, সবাই আমাকে বিহারি মনে করেছে। বিষয়টি জানার পর সবাই আবার এলেন। তাও আমার সামনে আলোচনা করতে কেমন যেন দ্বিধা করছিলেন। পরে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, ফোনে নির্দেশনা আসবে। একদিন ফোনে নির্দেশনা এলো, পরদিন আমাকে নরসিংদীর লঞ্চঘাটে যেতে হবে।

‘আমি যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাবা রাজি ছিলেন। মাও খুব বেশি বাধা দেননি। অন্যদের সঙ্গে আমিও লঞ্চে উঠলাম। আমরা পাঁচ জন ছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর পাকিস্তানি আর্মিদের মুখোমুখি হই। সামান্য ঝামেলার পর একটা ফার্ম হাউজের ঘাটে আমরা নেমে গেলাম। ঐ কৃষক তার শেষ মুরগিটা জবাই করে নিঃস্বার্থভাবে আমাদের খাওয়ালেন। পরদিন রাতে আমরা আদমজী জুট মিলে চলে আসি। পরদিন কুমিল্লা হয়ে আগরতলায় গেলাম। সেখান থেকে আমাকে দিল্লি নিয়ে গেল। কয়েক দিন সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে আনা হলো। সেটি ছিল আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তর। সেখানে জেনারেল ওসমানীর প্রথম দেখা পেলাম। সেখান থেকে সবাইকে দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হলো। আমাকে জেনারেল ওসমানীর স্টাফ অফিসার নিয়োগ দিয়ে রেখে দিল। আমি মূলত আমাদের নেতাদের তথ্যগুলো ভারতের হাইঅফিশিয়ালদের সঙ্গে শেয়ার করতাম। তাদের সিদ্ধান্তগুলো আমাদের নেতাদের জানাতাম। অনেকটা ইন্টেলিজেন্সের মতো করে কাজ করতাম।’

তিনি বলেন, ‘২২ বা ২৩ সেপ্টেম্বরের কথা। ভারতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এলেন এ কে খন্দকার। খানিকটা অস্হির দেখলাম তাকে। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ভারত তিনটি এয়ারক্র্যাফট দিয়েছে আমাদের। এখন আমাদের একটা মুক্তিবাহিনীর বিমান উইং বানাতে হবে। দুজনে বসে পরিকল্পনা করলাম। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অনেক পাইলট ছিল আমাদের। কিন্তু তারা সম্মুখযুদ্ধে চলে গেছেন। ভালো যুদ্ধ করছেন। আমি তখন প্রস্তাব দিলাম আগরতলায় অনেক বেসরকারি এয়ারলাইন্সের পাইলট মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে এসেছেন। তাদের মধ্য থেকে আমরা পাইলট নিতে পারি। উনি আমার বুদ্ধির প্রশংসা করলেন। আমাকেই দায়িত্ব দিলেন পাইলট খুঁজে আনতে। আগরতলা গিয়ে আমি ছয় পাইলটসহ ৪৭ জন এয়ারম্যানকে খুঁজে আনলাম। তাদের নিয়ে সরাসরি চলে গেলাম নাগাল্যান্ড রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা ডিমাপুর। সেখানেই সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। ২৮ সেপ্টেম্বর আমাদের এয়ারফোর্স গঠিত হলো। সেদিন ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধানসহ আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সবাই সেখানে উপস্হিত ছিলেন।

‘এরপর অপারেশন পরিকল্পনা শুরু হলো। প্রথমে ঢাকা এয়ারপোর্ট টার্গেট ছিল। কিন্তু ওখানে ওদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। তখন আমরা ঐ পরিকল্পনা বাদ দিই। পরে পরিকল্পনা হলো তেলের ডিপোতে আমরা হামলা চালাব। চট্টগ্রামের রিফাইনারিকে আমরা টার্গেট করলাম। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম দেশ স্বাধীন হলেও তো রিফাইনারি লাগবে। এটা বানাতে তো অনেক টাকা খরচ হবে। পরে সেটাও বাদ দিলাম। নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামে তেলের ডিপো আমরা টার্গেট করলাম। আমি ছিলাম নারায়ণগঞ্জের অপারেশনে। ঐ অপারেশনে ছয়টি তেলের ট্যাংকার ধ্বংস করেছিলাম। ৪ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আখাউড়া, সিলেট, নরসিংদীর রায়পুরায়সহ ১৬টি সফল অপারেশন করেছি। সিলেটের একটা অপারেশনে পাকিস্তানি আর্মির বেশ কয়েকটি ট্রাক ওপর থেকে গোলা ফেলে ধ্বংস করেছিলাম। সেখানে অন্তত ২১ জন মারা যান। ১৬ ডিসেম্বরেই দেশে ফিরে আসি। আত্মসমর্পণের ওখানে না গিয়ে সরাসরি বাসায় যাই। তখন বাবা-মায়ের কথা খুব মনে হচ্ছিল। দেশ স্বাধীনের পর বিমানবাহিনীতেই থাকলাম। ১৯৮১ সালে স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে অবসর নিই।’

ইত্তেফাক/কেকে