বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘ ৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ দক্ষিণ সুদান। সে দেশের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকা ওয়াও প্রদেশ। সেখানে সাহসিকতার সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে কাজ করছে (ব্যানব্যাট-৫) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাকে দেশে রেখে দায়িত্ব পালন করেন তারা। তবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সুদানবাসীর মধ্যেই আপনজনের মমতা খুঁজে পান।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক ভালোমতোই চেনেন সুদানবাসী। শান্তিরক্ষীরা যখন টহলে বের হন, তখন পোশাক দেখেই সুদানের শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের নারী-পুরুষ বুঝতে পারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহলে বেরিয়েছেন। খেলাধুলা ফেলে শিশুরা ছুটে যায় গাড়ির কাছে। তখন টহল গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। শিশুদের তারা জড়িয়ে ধরেন পরম মমতায়। গাড়িতে নিজেদের জন্য রাখা পানি ও খাদ্যসামগ্রী দুই হাতে বিলিয়ে দেন শান্তিরক্ষীরা। নির্মল ভালোবাসা ও খাদ্যসামগ্রী পেয়ে অনেক খুশি হয় সুদানের শিশু-কিশোররা।
সুদানের শিশুসহ সব বয়সি মানুষজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে পেয়ে বলে, ‘বাংলা ছপছপ (খাবার দাও)’ ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’। এসব শুনে বুকটা ভরে যায় বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের।
যুদ্ধপীড়িত এই দরিদ্র শিশুদের শরীরে পরার মতো জামাকাপড় নেই। তখন দেশে নিজের সন্তানের কথা চিন্তা করে আবেগতাড়িত হয়ে যান শান্তিরক্ষীরা। এ দৃশ্য চোখে না দেখলে অনুধাবন করা কঠিন, সুদানের শিশু-কিশোররা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কত আপন। ঐসব শিশুদের কাছে গিয়ে আবেগ সংবরণ করতে পারেন না তারা। সুদানের শিশু-কিশোরসহ সকল বয়সিদের কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি আস্থার প্রতীক।
এদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলতে উদগ্রীব থাকেন। সারা দিন দায়িত্ব পালন শেষে সন্ধ্যায় মাঠে, খোলা আকাশের নিচে বসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিও কলে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তখন তাদের মধ্যে ফিরে আসে স্বস্তি।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দক্ষিণ সুদানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য, বস্ত্র বিতরণ ও চিকিত্সাসামগ্রীসহ আর্ত-মানবতার সেবায় নিয়োজিত। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েও তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলছেন। ওয়াও প্রদেশের ওয়েস্টার্ন বাহার আল গজল, নর্দান বাহার আল গজল ও ওয়াররাফ—এই তিন অঙ্গরাজ্য মিলে ব্যানব্যাট-৫। এসব এলাকায় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত। সুদানে দিনে তাপমাত্রা থাকে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সন্ধ্যায় পর তাপমাত্রা কিছু কমে আসে। নানা ধরনের পোকা-মাকড় ও সাপ আছে সেখানে। এত বৈরী অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিরামহীনভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
দক্ষিণ সুদানের ব্যানব্যাট-৫ এ শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য আব্দুল হক। রাজশাহীর গোদাগাড়িতে তার বাড়ি। এক ছেলে ও এক মেয়ে তার। মা আছে, বাবা নেই। সন্ধ্যার পর তিনি কথা বলছিলেন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে। এ সময় তার চোখের পানি টলটল করতে দেখা যায়। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে আব্দুল হক বলেন, পরিবার-পরিজন থেকে ৭ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকি। যখনই সময় পাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি। তিনি বলেন, সুদানবাসী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সেবায় সন্তুষ্ট। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখলেই সুদানের শিশু-কিশোরসহ সব বয়সিরা ছুটে আসে কথা বলার জন্য। তাদের সঙ্গে কথা বলে স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়।
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বাসিন্দা মামুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য। তিনিও ব্যানব্যাট-৫ এ কর্মরত। তার এক ছেলে। মা-বাবা ও স্ত্রী আছে। সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন মামুন। তিনিও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সেনাবাহিনীর সদস্য রুবেলের বাড়ি কুষ্টিয়ার কামারখালীতে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। মা-বাবাও আছেন। তাকেও সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবেগতাড়িত কণ্ঠে কথা বলতে দেখা যায়। সার্জেন্ট শাহিনের তিন মেয়ে ও স্ত্রী আছে। বাবা-মা নেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য শামসুজ্জামানের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার দুই ছেলে। সার্জেন্ট আব্দুল গফুরের বাড়ি কক্সবাজারে। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সন্ধ্যার পর তাদেরও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে।
