লবণ পানিতে দুঃসহ জীবন

  • ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • নিঃস্ব হচ্ছে পাইকগাছার ১৩ গ্রামের মানুষ
  • চার দফা দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০২:৩৭

‘লবণাক্ততার কারণে আমরা জল খাতি পারিনে, রান্নাবান্না করতি পারিনে, জমিতি তরিতরকারি হয় না, গাছপালা হয় না, খেতে ধান হয় না, লবণ পানিতি গাছপালা সব মোরে যাচ্ছে, পুকুরির জলে নামলি চুলকানি হয়, পেটের পীড়া সব সময় লাগেই থাহে। আমরা খুব কষ্টের মধ্যি আছি, কাউরি কলিও কোনো কাজ হয় না, কেউই মিষ্টি জলের ব্যবস্হা করে দেয় না, তুমরা কী একটু মিষ্টি জলের ব্যবস্হা কোরে দিতি আইছাও।’ এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের রাঁধানগর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রণিতা বিশ্বাস।

শুধু রণিতা বিশ্বাসই নন, পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ও লতা ইউনিয়নের ২০ ও ২০/১ নম্বর পোল্ডারের মধুখালী, পার মধুখালী, জোকারহুলো, রাঁধানগর, দিঘলিয়া, চক্রিবক্রি গেওয়াবুনিয়া, মুনকিয়া, হানিরাবাদ, রেখামারী, আশারনগর, বাইনচাপড়া, গোয়াছাবাসহ ১৩টি গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ বছরের পর বছর ধরে লবণ পানিতে বন্দি হয়ে আছে। তাদের দুঃখ লবণপানির চিংড়ি চাষ।

কয়েকদিন আগে লতা ও দেলুটি ইউনিয়নের ২০ ও ২০/১ নম্বর পোল্ডারে অবস্হিত ১৩টি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, রাস্তাঘাটের দুরবস্হা। ফসলহীন মাঠ খাঁ খাঁ করছে। কোথাও কোথাও চাষ হচ্ছে লবণ পানির বাগদা চিংড়ি। আবার কোথাও নদী থেকে ঘেরে চিংড়ি চাষের জন্য মেশিন দিয়ে লবণ পানি তোলা হচ্ছে। মাঠগুলোতে গাছপালার সংখ্যা খুবই কম। এভাবে মনুষ্যসৃষ্ট ও জলবায়ু বিপর্যয়জনিত কারণে ধীরে ধীরে দরিদ্র অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে খুলনার দক্ষিণের জনপদ। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা আর লবণ পানির চিংড়ি চাষের কারণে খাদ্য উত্পাদন একেবারেই কমে গেছে। একই কারণে গাছপালা, 

 গবাদিপশু কমে গিয়ে এক সময়ের বর্ধিষ্ণু জনপদ বিরাণ হয়ে যাচ্ছে। নীরবে উদ্বাস্ত্ত হয়ে পড়ছেন এই এলাকার মানুষ।

দেলুটি ইউনিয়নের দিঘলিয়া গ্রামের শিবশঙ্কর বলেন, তিনি খুলনা সরকারি আযম খান কমার্স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। চাকরি পাননি তাই বাড়িতেই বসে আছেন। কিছু জায়গাজমি থাকলেও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই জমি অনাবাদী থাকে। বাড়ির আঙ্গিনায় যে একটু শাকসবজি, তরিতরকারির চাষ করবেন তাও করতে পারেন না। লবণাক্ততার কারণে হাঁস-মুরগিও মরে যায়। তাই কেউ হাঁস-মুরগিও পুষতে চায় না।

তিনি বলেন, দেলুটি ও লতা ইউনিয়নের ১৩টি গ্রামের মানুষের জীবন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। এসব গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কাজের জন্য খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে চলে যাচ্ছে।

চার দফা দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন, স্মারকলিপি

এদিকে দেলুটি ইউনিয়নের ২০ ও ২০/১ নম্বর পোল্ডারে চিংড়ি চাষের জন্য কৃষি জমিতে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধসহ চার দফা দাবিতে মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছে এলাকার মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে এই স্মারকলিপি দেয়া হয়। অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে পোল্ডার অভ্যন্তরে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ ও সরকার ঘোষিত সিদ্ধান্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করা, আদালতের আদেশ যারা উপেক্ষা করে এখনো লবণ পানি তুলছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্হা গ্রহণ এবং বর্ষা মৌসুমের আগেই বন্যা নিয়ন্ত্রনে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। মানববন্ধনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন কুমার মন্ডল, প্যানেল চেয়ারম্যান সুকুমার কবিরাজ ও রামচন্দ্র টিকাদার, সদস্য চম্পক বিশ্বাস, কিংশুক রায়, মেরী রাণী সরদারসহ পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্হিত ছিলেন। পরে মানববন্ধনকারীরা তাদের দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে স্মারকলিপি দেন।

বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা

দেলুটি ও লতা ইউনিয়নে খোঁজখবর নেওয়ার সময় স্হানীয়রা এ প্রতিবেদককে জানান, এই এলাকার অধিকাংশ জমিই এখন শহরের (খুলনা শহর) ধনী মানুষদের। এ সব জমি লোনা পানির চিংড়ি চাষের জন্য তারা ঘের মালিকদের কাছে বছর চুক্তিতে লিজ দিয়েছে। ঘের মালিকরা ২০ ও ২০/১ পোল্ডারের ১৫০ থেকে ২০০ পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে ঘেরগুলোতে লবণ পানি ঢুকাচ্ছে। লোনা পানির কারণে এ অঞ্চলের কৃষি ও গবাদিপশু খাত পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার পথে। এ কারণে দেশের অন্যান্য স্হানের তুলনায় উপকূল অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে কাজের সন্ধানে এ অঞ্চলের মানুষ খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে ছুটছে। মাঠ পর্যায়ে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জীবিকার সন্ধানে এলাকা ত্যাগ এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

স্হানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ-প্রতিবেশ উপেক্ষা করে গুটিকয়েক মানুষের অতিলোভের কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

হানি গ্রামের চন্দ্রা সরকার বলেন, ‘আমরা ভালোভাবে বাঁচতে চাই। এখানে স্কুল-কলেজের সমস্যা। বাচ্চাদের ভালো খাবার দিতে পারি না। শাকসবজি, মাছ, দুধ কিছুই নেই। নেতারা নির্বাচনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচন চলে গেলে কেউ আর খোঁজ নেয় না। লবণ পানি আমাদের শেষ করে দিচ্ছে।’

দিঘলিয়া গ্রামের পলাশ মন্ডল (৫২) বলেন, ‘আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। ওয়াপদা বাঁধ না হলে আমাদের বাঁচার উপায় নাই।’

দেলুটি গ্রামের বিজন কুমার সরদার (৫২) বলেন, জনপ্রতিনিধিরা যা বলেন, তা করেন না। আশির দশক থেকে লবণ পানির চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছে। আমরা আন্দোলন করছি। তারা নানান প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন হয় না। লবণে সব শেষ। আমাদের আর বাঁচার পথ নেই।

আলোকদ্বীপ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুকৃতি মোহন সরকার ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে বলেন, লবণের বিরুদ্ধে এবার সবাই এক ছিল। এমপি, ইউএনও সবাই এসেছিলেন। আমরা আবার ফসলের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সবকিছু এখন শেষ। কেউ কথা রাখেনি।

দেলুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন কুমার মন্ডল বলেন, ‘আমাদের এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ লবণ পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ চায় না। চিংড়িতে লাভ নেই। শুধু তরমুজ চাষ করলে ৭০-৯০ হাজার টাকা পাওয়া সম্ভব। তাই সবার প্রতিশ্রুতিতে এ বছর আশার আলো দেখেছিলাম। বহিরাগত প্রভাবশালীরা তাদের লাভের জন্য হাজার হাজার মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যেসব স্হানে বাঁধে পাইপ রয়েছে, আম্ফানের সময় সেগুলো ভেঙে গেছে। এতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। আমরা শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করব।’

লতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছি না। কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের মুনাফার জন্য সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে। শত শত বিঘা জমির মালিকরা এখানে থাকেন না। তারা সামান্যতে লাভবান হন। আর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আমরা সাধারণ মানুষ এ অবস্হা থেকে রেহাই চাই।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, উপকূল অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় কৃষি জমিতে লবণপানি তুলে চিংড়িচাষ করা হচ্ছে, যা উচ্চ আদালতের রায়ের সম্পূর্ণ পরিপম্হি।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মমতাজ বেগম বলেন, আমরা লবণপানি বন্ধ করার ব্যবস্হা গ্রহণ করছি। শিগ্গির অভিযান চালাব।

এ ব্যাপারে স্হানীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, আমাদের লবণপানি থেকে মিষ্টি পানিতে ফিরে আসতে হবে। আমরা ঘের করব, তবে সেই ঘের হবে মিষ্টি পানির। পাইকগাছা ও কয়রাকে সবুজ ও শুদ্ধ করতে আমাদের প্রকল্প অব্যাহত থাকবে। আর লবণপানির ব্যাপারে স্হানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও দেখভাল করবেন।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি