‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দুটি শব্দে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধে যাই’ 

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ১০:১৪

‘২৩ মার্চ চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে সবাইকে ব্যারাকে অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। বুঝতে বাকি রইল না, কী ঘটতে যাচ্ছে। ২৬ মার্চ রাতের আঁধারে ব্যারাকের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে পালালাম। পরদিন সকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম তালিকায় তুললাম। নিজের খাকি উর্দি ছেড়ে গামছা গায়ে লুঙ্গি পরে নিলাম ছদ্মবেশ। স্থায়ী চাকরি ছেড়ে শুরু হলো যুদ্ধজীবন।’ ইত্তেফাকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের যুদ্ধে যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন লে. কমান্ডার (অব.) মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন বীর-উত্তম।

যুদ্ধের সময় ৩৫ বছরের তাগড়া জোয়ান মানুষটির বয়স এখন ৮৬ বছর। তবু মনে হলো চোখের কোণে তার সোনালি  দিনের স্মৃতি। নৌ-কমান্ডো বীর-উত্তম জালাল উদ্দীন বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন তিনি ছিলেন পিএনএস বখতিয়ারে একজন লিডিং সি ম্যান বা নাবিক। এই পিএনএস বখতিয়ার ছিল পাকিস্তান নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি।

এর কিছুদিন আগে পাকিস্তানের করাচি থেকে বদলি হয়ে চট্টগ্রামের বখতিয়ার ঘাঁটিতে আসেন জালাল উদ্দীন। ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর থেকে তার মনে পরিবর্তন শুরু হলো। তিনি বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—মুক্তি ও স্বাধীনতা—এই দুই শব্দই আমাকে অনুপ্রাণিত করল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করতে।’

বখতিয়ার ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ২৭ মার্চ ভোরে তিনি গেলেন চট্টগ্রামের হালিশহরে এম এ আজিজ এবং এম এ মজিদের বাড়িতে। যেখানে সুবেদ আলী ভূঁইয়াসহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এরপর ২৯ মার্চ তাদের ১২০ জনকে নিয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধার দল গঠন করা হলো। কিন্তু বিধি বাম! ৩০ মার্চ পাকিস্তান বাহিনী অ্যামবুশ করে তাদের ওপর! তার সঙ্গে থাকা ১৫-১৬ জন শহিদ হলেন। সবাই ভড়কে গেলেন। যে যার মতো গা ঢাকা দিলেন। পরদিন সকালে জালাল উদ্দীন চলে গেলেন তার পরিবারের কাছে। চট্টগ্রামের বখতিয়ার ঘাঁটিতে ছিলেন তার স্ত্রী শিরিন, পুত্র বিলালউদ্দীন, কন্যা নার্গিস এবং ভাগনি সিয়ারুন। তাদের সঙ্গে নিয়ে হাঁটা দিলেন গ্রামের বাড়ি মাগুরার উদ্দেশে। প্রায় পাঁচ দিন হেঁটে, কিছু ছোট ছোট যানবাহনে তারা গ্রামের বাড়ি পৌঁছালেন। এই স্মৃতি বলতে গিয়ে জালাল উদ্দীন বললেন, ‘আমার স্ত্রীর সহযোগিতা না পেলে মুক্তিযুদ্ধ করা হতো না। সে সময় দেশের সবার মতো আমার স্ত্রীও অনেক কষ্ট করেছেন। সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করেছেন। আমি মনে করি, আমার স্ত্রীও একজন মুক্তিযোদ্ধা।’

গ্রামের বাড়িতে ফিরেও থাকা হলো না জালাল উদ্দীনের। তাকে খুঁজতে স্থানীয় মোহাম্মদপুর থানার ওসি এলেন বাড়িতে। সেই স্মৃতি মনে করে তিনি বলছেন, ‘১৫ এপ্রিল মোহাম্মদপুর থানার ওসি এসে বললেন, হয় আমাদের সঙ্গে থানায় চলেন, না হলে বাড়ি ছাড়েন। এরপর ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ২৫ এপ্রিল ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দিলাম। তিন দিন পর পৌঁছালাম রানাঘাট।’ এই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, ‘এরপর ২৮ এপ্রিল এম এ জি ওসমানী এলেন ক্যাম্পে। তিনি বললেন—তুমি ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের ওখানে যাও। ওসমানীর স্বাক্ষর করা চিঠি নিয়ে গেলাম ৯ নম্বর সেক্টরে। সেখানে থাকলাম ১২ মে পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে আমরা ৩৫০ জনের মতো প্রশিক্ষণ নিলাম পলাশীতে। সেখানে আমাদের দলের এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলল আগস্ট মাস পর্যন্ত।

‘দিনগুলো যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ততটা সহজ ছিল না। পরনের জামার সংকট, খালি পা, আধপেটা খাবারের মধ্যে বুকভরা মনোবলই শুধু ছিল তখন মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র সম্বল। তেমনি মনোবল নিয়ে পলাশীতে প্রশিক্ষণ নেওয়াদের মধ্য থেকে ১৪ জনের একটি দল নিয়ে ছয় দাঁড়ের একটি নৌকায় করে হাসনাবাদ হয়ে সুন্দরবন পৌঁছালাম আমরা। আমাদের সঙ্গে ছিল চারটি এসএমজি, ১৪টি লিম্পেট মাইন আর এসএলআর-এর ২০ হাজারের মতো গুলি।’

১৭-১৯ আগস্ট তিন দিনের অভিযানে পাকিস্তানিদের দখলে থাকা ফরেস্ট অফিস গুঁড়িয়ে দেন তাদের সদস্যরা। জালাল উদ্দীনসহ কয়েক জন নৌ-কমান্ডো ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ভেতরে হরিনগরে গোপন আশ্রয়স্হলে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। এ সময় সেই আশ্রয়স্হলের অদূরে বয়ে যাওয়া নদী থেকে ভেসে এলো ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ। গ্রামবাসী কয়েক জন দৌড়ে এসে খবর দিলেন, নদীতে দুটি জাহাজ আসতে দেখা যাচ্ছে। নৌ-কমান্ডোদের বুঝতে বাকি থাকল না, ওগুলো আর কিছু নয় পাকিস্তানি গানবোট। খাবার রেখে তারা উঠে পড়লেন। বেশ ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত তারা। শক্তিবলও সামান্য। দলটি মাত্র ১২ জনের। অস্ত্র বলতে একটি এলএমজি, পাঁচটি এসএমজি ও ছয়টি এসএলআর। তার পরও তারা সাহসী এক সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানি ঐ গানবোট আক্রমণ চালানোর। এরপর তারা দ্রুত প্রস্ত্তত হয়ে গ্রামবাসীকে বললেন নিরাপদ অবস্থানে থাকতে। নৌ-কমান্ডোরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে নদীর তীরে বাঁধে অবস্থান নিলেন। গানবোট দুটির প্রথমটি বেশ এগিয়ে। দ্বিতীয়টি কিছুটা দূরে। প্রথম গানবোটটি নৌ-কমান্ডোদের নাগালের মধ্যে আসামাত্র গর্জে উঠল তাদের সবার অস্ত্র। গানবোটের সামনের গানার গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল। আহত হলো আরো কয়েক জন। অক্ষত নৌসেনারা ছোটাছুটি করতে থাকল। ভীতসন্ত্রস্ত ক্যাপ্টেন গানবোটের গতি বাড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে গেল। দ্বিতীয় গানবোট থেকে গোলাবর্ষণ হতে লাগল। নৌ-কমান্ডোরা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সেই আক্রমণ অনেকক্ষণ ধরে মোকাবিলা করলেন। জালাল উদ্দীন এ যুদ্ধে অসীম সাহস ও রণনৈপুণ্য দেখান।

অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় মংলা ও হিরণ পয়েন্টে নৌ-অপারেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আগস্টে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো ভারত থেকে কয়রা থানার বেদকাশীতে আসেন। সেখান থেকে ১২ জন নৌ-কমান্ডো হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে হিরণ পয়েন্টে অভিযানের জন্য রওনা হন। এই দলে ছিলেন জালাল উদ্দীন। তাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দীন (পরে মেজর)। তিনি তাদের হিরণ পয়েন্টে না পাঠিয়ে বরিশালের রাজাপুরে নিয়ে যান। ফলে অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় হিরণ পয়েন্ট অভিযান ব্যর্থ হয়। নৌ-কমান্ডো দলকে রাজাপুরে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসিয়ে রাখা হয়। এতে নৌ-কমান্ডোদের মধ্যে অসন্েতাষের সৃষ্টি হয়। বিশেষত, জালাল উদ্দীন দলনেতাকে কয়েক বার এভাবে সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করার জন্য বলেন। এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে একদিন তারা যুদ্ধের সরঞ্জাম ও নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কোনো পথপ্রদর্শক ছাড়াই ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।

১২ নভেম্বর মোংলা পোর্টের বাইরের অংশে ২৫০ কেজি ওজনের ছয়টি মাইন ফেলে জালাল উদ্দীনের দল। সে সময় তারা একটি জাহাজ দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে ২০০ রাউন্ড গুলি করে ব্রিটিশ ঐ জাহাজটিকে সারেন্ডার করিয়ে কলকাতা নিয়ে যান তারা। এ সময় মাইনের আঘাতে ডুবে যায় অপর একটি জাহাজ। একই এলাকায় ১৩ নভেম্বর একটি গানবোট ডুবিয়ে দেন তারা। ৯ ডিসেম্বর বিএনএস পদ্মা ও পলাশে করে বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা আর আইএনএস পানভেইল ও চিত্রাঙ্গদায় ভারতের বিএসএফ সুন্দরবন হয়ে মোংলা, তারপর খুলনার দিকে আসতে থাকেন। এ সময় ওপর থেকে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হয় বিএনএস পদ্মা ও পলাশের ওপর। এ ঘটনায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনসহ ১০ জন শহিদ হন। আর ২১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করে রাজাকারেরা। কোনোরকমে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম জালাল উদ্দীন তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে চলে যান মোংলা। এরপর ২৪ ডিসেম্বর জালাল উদ্দীন যোগ দিলেন পুরোনো পেশায়, তবে স্বাধীন দেশে বীরের বেশে।

ইত্তেফাক/কেকে