যে উন্নত গুণাবলি মানুষকে সুশোভিত করে, প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, তার অন্যতম একটি হচ্ছে আমানত রক্ষা। এ গুণটি দুনিয়াতে যেমন মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ, তেমনি আখেরাতেও তার নাজাতের অন্যতম অসিলা। দুনিয়া সৃষ্টির সূচনালগ্নে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তার দিনকে আমানত হিসেবে আসমানের কাছে, জমিনের কাছে, পাহাড়ের কাছে পেশ করেছিলেন। সবাই তার এই আমানত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, অপারগতা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু একমাত্র মানবজাতিই এই মহামূল্যবান আমানত গ্রহণ করেছিল। এই মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সে জানান দিয়েছিল, সে কেবল আল্লাহর দিনের দায়িত্বই পালন করবে না, তার ওপর দুনিয়াবি সব আমানত রক্ষার ব্যাপারে এবং দায়িত্ব পালনেও সক্ষম।
ছোট-বড়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্তব্য হচ্ছে আমানত রক্ষা করা এবং অর্পিত সব দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করা। সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার মালিকের কাছে পৌঁছে দাও।’ এই আমানত রক্ষার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স.)। হিজরতের সময় কাফেররা যখন নবিজিকে ঘিরে রেখেছিল, জীবন নিয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন মানুষের গচ্ছিত আমানত তিনি হজরত আলি (রাযি.)-এর কাছে সোপর্দ করে আবু বকর (রাযি.)-কে সঙ্গে করে মদিনায় রওনা হন। আর পরের দিন আলি (রাযি.) রসুলের সেই রেখে যাওয়া আমানত দায়িত্বের সঙ্গে মানুষকে বুঝিয়ে দেন। জীবনের ঝুঁকির মুখে যেই নবি আমানতের খেয়ানত করেননি, আমরা তার উম্মত হয়ে কখনো আমানতের খেয়ানত করতে পারি না, দায়িত্বে অবহেলা করতে পারি না। আমানত হচ্ছে দিন রক্ষার স্মারক। আহমাদ শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, নবি করিম (স.) বলেছেন, ‘যার মাঝে আমানতদারি নেই, তার দিনও নেই।’
আমানত শব্দটি ব্যাপক এবং বহুমুখী একটি শব্দ। আমরা অনেকেই এটিকে খুব সীমিত আকারে বুঝে থাকি; বিষয়টি তা নয়, শুধু গচ্ছিত দ্রব্যের রক্ষণাবেক্ষণই আমানত নয়; আরো অনেক বিষয়ের আমানত রয়েছে। যেমন—কথার আমানত, দায়িত্বের আমানত, পরামর্শের আমানত, গোপনীয়তা রক্ষার আমানত, ইজ্জতের-আবরুর আমানত, ইলমের আমানত, ইমানি দায়িত্ব পালনের আমানত, ন্যায়বিচারের আমানত, রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনের আমানত, নেতৃত্বের আমানত, জনগণের আমানত, চাকরির আমানত, ব্যবসায়ের আমানত, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের আমানত, পরিবার লালন-পালনের আমানত, তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার আমানত, ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে, যা সঠিকভাবে পালন করা আমাদের জন্য ফরজ।
আমরা প্রত্যেকেই নিজের অবস্থানে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। বুখারি-মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, নবি করিম (স.) বলেন, ‘তোমাদের সকলেই দায়িত্বশীল, সকলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসনকর্তা দায়িত্বশীল; তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার ঘরে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীর গৃহে দায়িত্বশীলা; তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সেবক তার মালিকের সম্পদে দায়িত্বশীল; তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতএব, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। সকলকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে।’
আমানতের খেয়ানত এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য আমাদেরকে কেয়ামতের ময়দানে কঠোর এবং ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। সুরা আল ইমরানের ১৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমানতের খেয়ানত করবে, কেয়ামতের দিন সে খেয়ানতকৃত মালসহ উপস্থিত হবে এবং প্রত্যেক হকদারকে খেয়ানতকারীর আমল থেকে তা পূর্ণ করা হবে, তাদের প্রতি কোনো ধরনের জুলুম করা হবে না।’
অতএব, আমাদেরকে এই দুনিয়া থেকেই সতর্ক হতে হবে, কারো হক যেন আমরা নষ্ট না করি, দায়িত্ব পালনে যেন অবহেলা না করি। আল্লাহ আমাদেরকে সে তাওফিক দান করুন। আমিন!
লেখক: মুহাদ্দিস, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা গোপালগঞ্জ ও খতিব, উত্তর শাহজাহানপুর আমতলা জামে মসজিদ, ঢাকা।
