ঘোষণা দিয়েও যুদ্ধবিরতি মানছে না রাশিয়া 

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০০:৫৪

বেসামরিক মানুষদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য দুইটি শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েও তা মানছে না রাশিয়া। মারিউপোল এবং ভলনোভাখা শহরে মস্কোর স্থানীয় সময় শনিবার সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা) থেকে এই বিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মারিউপোলের ‘মানবিক করিডোর’ এর জন্য নির্ধারিত রুটে রুশ বাহিনী বোমা হামলা অব্যাহত রাখায় লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে ইউক্রেনের আকাশে নো-ফ্লাই জোন করার পদক্ষেপ নেবে না ন্যাটো। তাদের এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

শনিবার দশম দিনের মতো ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা অব্যাহত রেখেছে রাশিয়া। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেকসি রেজনিকভ বলেছেন, ইউক্রেনের সেনারা শত্রুদের প্রতিহত করছে। প্রতিরোধের মুখে রুশ সেনারা এখন ধীরে এগোচ্ছে।

পূর্ব ইউক্রেনে বিধ্বস্ত একটি বিমান।

তিনি বলেন, রুশ সেনারা এখন ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে টার্গেট করে হামলা করছে। এর মধ্যে পরমাণু ও হাইড্রো বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বিপজ্জনক অবকাঠামোও রয়েছে। তার মতে, রুশ সেনারা এখন জোর দিচ্ছে কিয়েভকে ঘিরে ফেলতে এবং প্রতিরোধ ভাঙতে। ১০ দিন ধরে চলা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কতজন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। তবে প্রায় ১২ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আরো কয়েক লাখ মানুষ এখন আশ্রয়ের সন্ধান করছেন।

যুদ্ধবিরতি মানছে না রাশিয়া

শনিবার প্রথম বারের মতো আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় রাশিয়া। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, বেসামরিক মানুষদের নিরাপদে সরে যেতে দেওয়ার জন্য দুইটি শহরে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এ বিষয়ে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই মারিউপোলে রুশ সেনারা যুদ্ধবিরতি মানছে না বলে অভিযোগ ওঠে।

ইউক্রেনের খেরসন শহরে বিধ্বস্ত একটি ভবন।

মারিউপোলের ডেপুটি মেয়র সেরহাই অরলভ বলেন, রুশ সেনারা আমাদের ওপর এখনো বোমা ফেলছে, গোলাবর্ষণ করে চলেছে। মারিউপোলে কোন যুদ্ধবিরতি নেই, শরণার্থী যাতায়াতের পথেও কোন যুদ্ধবিরতি নেই। আমাদের বেসামরিক মানুষ শহর ছাড়তে চায়, কিন্তু তারা গোলাবর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে পারছে না। পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, ঐ শহর থেকে বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে রাশিয়া অভিযোগ করে বলেছে, ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদীরা বেসামরিক মানুষদের শহর ছাড়তে বাধা দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ন্যাটোর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি

শুক্রবার ব্রাসেলসে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে ন্যাটো মহাসচিব ইয়েন্স স্টলটেনবার্গ বলেন, ইউক্রেনের আকাশে নো-ফ্লাই জোন করার পদক্ষেপ তারা নেবে না। এর কারণ ইউক্রেন কিংবা রাশিয়া কেউই ন্যাটোভুক্ত দেশ নয়। নো ফ্লাই জোনের পদক্ষেপ নেওয়ার আরেক অর্থ হলো—রুশ যুদ্ধবিমানে ন্যাটোর হামলা। যাতে পরমাণু শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

ন্যাটোর এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, এখানে যত মানুষ মারা যাবে, তাদের জন্য আপনারাই দায়ী হবেন। এর মাধ্যমে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এদিকে গুঞ্জন উঠেছে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন জেলেনস্কি। তবে গুঞ্জন উড়িয়ে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি রাজধানী কিয়েভেই আছেন।

রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের

রাশিয়ার ওপর বহুমুখী আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে এবার দেশটি থেকে জ্বালানি তেল আমদানি কমানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেন সাকি বলেছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ঠিক রেখে আমরা রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর উপায় খুঁজছি।

পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ক্ষোভ রাশিয়ার

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় ধুঁকছে রুশ অর্থনীতি। এ অবস্থায় রুশ সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে-তারা ‘অর্থনৈতিক ডাকাতি’ শুরু করেছে। গতকাল ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই মন্তব্য করে বলেন, রুশ সরকার এর বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নেবে। তবে সেই পদক্ষেপ কী হতে পারে তা বলেননি। শুধু এটুকুই বলেছেন যে, রাশিয়ার স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পেসকভ আরও বলেন, রাশিয়া এত বড় এক দেশ যে তাকে কখনই একঘরে করে রাখা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের চেয়েও বিশ্ব আকারে অনেক বড় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনা।

এদিকে রাশিয়ার দুই জন শীর্ষ ওলিগার্ক (ধনকুবের) এর দুইটি ইয়ট বা প্রমোদতরি আটক করেছে ইতালির পুলিশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জারি করা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইতালির পুলিশ এই ব্যবস্থা নিয়েছে।

অ্যারোফ্লটের ফ্লাইট বাতিল করেছে রাশিয়া

রাশিয়ার জাতীয় বিমান সংস্থা অ্যারোফ্লট আগামী ৮ মার্চ থেকে প্রায় সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছে, ফ্লাইট পরিচালনায় তারা অতিরিক্ত বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। তবে সংস্থাটি বলছে, একমাত্র প্রতিবেশী দেশ বেলারুশ এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো চলবে। ব্রিটেন, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে তাদের আকাশ সীমায় অ্যারোফ্লটের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে সংস্থাটির জন্য বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী বহন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফেসবুক ও টুইটারে প্রবেশাধিকার বন্ধের সিদ্ধান্ত রাশিয়ার

ফেসবুক ও টুইটারে প্রবেশাধিকার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়ার সরকারি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর আগে বিবিসির রুশ ভাষা বিভাগের ওয়েবসাইট রাশিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডয়চেভেলে, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও লিবার্টি এবং মেডুজা মিডিয়া আউটলেটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও রাশিয়ায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। খবর বিবিসি, সিএনএন ও আলজাজিরার।

ইত্তেফাক/এএএম