সদা নিপীড়িত হয়ে আসা মানুষের কাছে স্বাধীনতা শব্দের মর্ম কতটা উত্তেজক তার একটি জলন্ত শিখা উজ্জীবিত হয়েছিলো ১৯৫২ সালে, যখন কথিত অলস বাঙালি এই বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে জীবন দিয়েছে, সেই উজ্জীবিত আলোর রেখা বহুদুর পার করে আসা ক্লান্ত মানুষকে দেখিয়েছে এক নতুন ভোরের সম্ভাবনা।
এই জলন্ত শিখা ধরেই আবর্তিত হয় পরবর্তী নানান ইতিহাস নানান আত্মত্যাগ। ধারাবাহিকতার হাত ধরে ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাশীল দল মুসলিম লীগকে বিপুল ভোটে হারিয়ে জয় লাভ করে ভাসানি – সোহরাওয়ার্দির যুক্ত ফ্রন্ট। জলন্ত শিখার এক অবিচ্ছেদ্য জ্বালানি হিসেবে জানান দিলো বাঙ্গালির ঐক্যবদ্ধতা ও যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা। বেড়ে উঠা এই অগ্নিশিখার উত্তাপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে পারলো না এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৫৮ সালে জারি করা হলো সামরিক শাসন যা নানান প্রতিকুলতা মধ্যে দিয়ে ১৯৬৬ সাল অব্দি আদোয়ালোয় চলতে থাকে।
১৯৬৬ সালে জ্বলতে থাকা জাতি কে মশাল হাতে পথ দেখানোর পথিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপন করে বাঙ্গালির মুক্তির সনদ, ৬ দফা এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত করানো শুরু করেন। এই ৬ দফাই এতদিনের সামরিক গ্যারাকলে আটকে থাকা বাঙ্গালিকে পুনর্জীবিত করে তোলা। যার পদরে খাতেই ১৯৬৮ সালে শুরু হয় স্বাধীনতা আদায়ের আন্দোলন। এবং এরই সুত্র ধরে শুরু হয় ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস। ঠিক এই যায়গায় এসে সেই ছোটো অগ্নিশিখা দাবানলের রূপ ধারণ করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দাবানলের জেরাকলে পরে তৎকালীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন যেখানে আওয়ামী মুসলিম লীগ বিপুল ভোটে জয় লাভ করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করলে বাঙ্গালির অগ্রগতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অতঃপর শেষ জ্বালানি স্বরূপ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ৭ই মার্চ এর ভাষণ এবং নাগরদোলায় চেপে বসা এক জনপদের মুক্তির শেষ নীলনকশা ছিলো এই ১৮ মিনিট এর ভাষণ।
তার পরের ইতিহাস মতেও সহজ সরল নয়, পাকিস্তানির ৭১ এর ২৫ এর মার্চ রাতে প্রথম প্রহরে গ্রেফতা বঙ্গবন্ধু বাঙালীদের শেষ জ্বালানিটুকু দিলে শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। যেখানে নাগরদোলায় চেপে বসা ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ত্রিশলক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আদায় করে নেয় নিজেদের স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি, বাঙালীর পথ প্রদর্শক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে এসে যুদ্ধবিদ্ধস্ত এই দেশের হাল ধরেন। নতুন ভোর দেখা এই জাতি এখন একই সাথে শোকাহত ও আনন্দিত। এমন দ্বিধায় ভোগা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করলেন পথ চলা। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন দেশে ও সংস্থায় স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং পুনঃপুন সফলও হয়। এবং ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে উত্থাপন করেন।
শেখ মুজিবের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য
এইভাবে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য সবে দূরের স্বচ্ছ আকাশে যখন আভা ছড়াতে শুরু করেছে। তখনই দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যার সাথে বয়ে আসে রাজনৈতিক অস্থিরতা। তখন কে জানত এমন আকাশে বসেও আসতে পারে আরও বড় কোনো মেঘের ভয়াল কালো থাবা। চারদিকে হঠাৎই ঘনিয়ে আসে অচেনা অন্ধকার, ১৫ই আগস্ট, এই দিনেই জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা এবং মরম বেদনার সূর হিসেবে জানাই, বাদ যায়নি ছোট্ট খোকা রাসেলও। তারপর থেকে পথে ফিরে আসা জাতি হাটতে শুরু করে এবড়োথেবরো ভয়াল পথে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে হয় সিপাহী ও জনতার বিপ্লব।
১৯৭৭ বগুড়া বিদ্রোহ, ২০০১ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিতে বোমা হামলা, ২০০১ সালে বাগেরহাট বোমা হামলা, ২০০১ সালে সুনামগঞ্জ বোমা হামলা, ২০০৪ সালে শাহজালাল বোমা আক্রমণসহ নানান ভয়াবহ দুর্ঘটনা যা এই দেশ ও দেশের মানুষকে উঠে দাঁড়ানোতে বিশাল অন্তরা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর ২০০৮ সালে জনগণের বিপুল ভোটে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করে দেশকে সুপথে আনার চেষ্টা করে। এই সময়কার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, যা দেশে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এইসব বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক সকল দিকে যথা নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করে। দেশকে নিয়ে গিয়েছেন উন্নতির পথে। সে হাত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে আজ ২০২২ এ এসেও সমমনা আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছেন নতুন নতুন দোরগোড়ায়, হয়েছেন মাদার অফ হিউম্যানিটি, পেয়েছেন পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্বের জন্য UN Environment Prize, নারী ক্ষমতায়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার জন্য UNESCO Peace Tree Award, বিশ্বের ১০০ জন নারী ক্ষমতার অধিকারী তালিকায় ফোর্বস এ ৫৯তম হয়েছেন, এছাড়াও আরও কত কি।
প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ব সম্মাননা পদক নিচ্ছেন ইউনিসেফ কর্তৃক
শুধু এসব ক্ষেত্রেই না দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে আমরা মৌলিক চাহিদার অভাব পূরণে যেরূপ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যার ফলে আমরা বর্তমানে মাত্র ৫০ বছরের মাথায় উন্নয়নশীল আয়ের দেশে পরিণত হওয়া বেশ বড় ব্যাপার। এক কথায় ৭০ বছরের মাথায় ২০২২ এ এসে যাতে গর্বিত বাঙালী বলতে কেউ দ্বিধা না করে তার জন্য যা যা দেশের উন্নতি হওয়া দরকার আমরা তার সম্পূর্ণটুকুই পেয়েছি। সাধুবাদ জানাই তাদের যাদের জন্য আজ আমরা গর্বিত।
