শতবর্ষের ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে কুমিল্লার খাদি

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১০:৫৬

কুমিল্লার খাদিশিল্পের তৈরি কাপড় দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে অতি প্রিয়। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এই কাপড়ের জনপ্রিয়তা বেড়ে ওঠে। ‘স্বদেশী পণ্য গ্রহণ কর আর বিদেশি পণ্য বর্জন কর’—এই স্লোগানের ওপর ভিত্তি করেই তত্কালীন সময়ে খাদিশিল্পের উৎপত্তি হয়। সেই থেকে শুরু করে আজো শতবর্ষের ঐতিহ্য, সুনাম ও খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখার লড়াইয়ে রয়েছে কুমিল্লার খাদি। 

একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের পোশাক হিসেবে পরিচিত হলেও কালের পরিক্রমায় খাদি পরিণত হয়েছে বাঙালির অন্যতম ফ্যাশন-প্রতীকে। শৈল্পিক ছোঁয়ায় কুমিল্লার খাদি এখন দেশ-বিদেশে বেশ সমাদৃত। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে খাদি। সব মিলিয়ে কুমিল্লার খাদি আজও অদ্বিতীয়। বাজারে সারা বছর বিক্রি হলেও ঈদ-পূজা বা বাঙালি সংস্কৃতির নানা উৎসবে এর কদর আরো বেড়ে যায়। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখনই রকমারি ডিজাইনের খাদিবস্ত্র তৈরি শুরু করা হয়েছে।

জানা যায়, ১৯৫২ সালে সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী ড. আখতার হামিদ খানের চেষ্টায় কুমিল্লার অভয় আশ্রমে ‘দ্য খাদি অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অভয় আশ্রমের কর্মীদের প্রচেষ্টায় কুমিল্লার গ্রামগুলোতে হাতে সুতাকাটা ও হস্তচালিত তাঁতের ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়। বিশেষ করে চান্দিনা উপজেলার আওরাল, বাড়েরা, মাধাইয়া, কুটুম্বপুর, বেলাশ্বর, হারং, রাড়িরচর, কলাগাঁও, গণিপুর, দেবিদ্বারের বরকামতা, সাইতলা, ফুলতলী, দোবারিয়া, বাখরাবাদ, ভানী, গুঞ্জর, দাউদকান্দির গৌরীপুর, মুরাদনগরের রামচন্দ্রপুর, রামকৃষ্ণপুর, ঘোড়াশাল, জাফরাবাদসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় হস্তচালিত তাঁতশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষ হাতে সুতা কাটার পেশায় জড়িয়ে পড়ে। 

কুমিল্লা আদর্শ সদর, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও মুরাদনগরের সহস্রাধিক তাঁতী পরিবার এ শিল্পের প্রসারে কাজ করছে। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরীর প্রায় অর্ধশত দোকানে খাদির পাঞ্জাবি, ফতুয়া, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, বিছানার চাদর, গায়ের চাদরসহ নজরকাড়া ডিজাইনের নানা পোশাক বিক্রি হচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদির সব ধরনের পোশাকে আধুনিকতা এলেও খদ্দরের সেই মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি এখনো আগের জৌলুস ধরে রেখেছে।

তবে দুঃখ প্রকাশ করে নগরীর অন্তত ১২ জন পুরোনো ব্যবসায়ী বলেন, ‘একসময় ঢাকাই মসলিনের মতো আরামদায়ক ছিল কুমিল্লার খাদি, এখন আর তেমনটি নেই। দিনে দিনে খাদির স্থান দখল করে নিচ্ছে মিশ্রিত আর লিলেন সুতার কাপড়। চরকা কাটা সুতোয় হাতের তাঁতে তৈরি খাদি কুমিল্লায় এখন দুর্লভ। 

চান্দিনার আওরাল গ্রামের নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথসহ কয়েক জন জানান, এখন শুধু তুলার সুতা দিয়ে খাদি উত্পাদিত হয় না। নারায়ণগঞ্জ থেকে সুতা এনে সেই সুতার মিশ্রণে কারিগররা খাদি তৈরি করছে। ফলে খাদির আদি রূপ বদলে গেছে, এখন আর খাদি পরে আগের মতো আরাম পাওয়া যায় না।

নগরীর কয়েকজন খাদি ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে দেশের চাহিদা পূরণ করে খাদির কাপড় রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর এলাকার ব্যবসায়ী প্রদীপ কুমার রাহা জানান, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে খাদি কাপড়ের দাম কিছুটা বেড়েছে। দামে ও গুণমানে কুমিল্লার খাদির চেয়ে এত কম মূল্যে কোনো ব্র্যান্ডের কাপড় পাওয়া যায় না। তবে স্বল্প পুঁজির অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ইত্তেফাক/ ইআ