শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চান হাদিসুরের মা

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২২, ২১:০৬

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’তে হামলার ঘটনায় আটকাপড়া ২৮ নাবিক দেশে ফিরেছেন। বুধবার (৯ মার্চ) দুপুর ১২টা ১ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-৭২২ বিমানে দেশে ফেরেন তারা। ওই হামলায় নিহত হন হাদিসুর রহমান আরিফ। তবে ২৮ নাবিক ফিরলেও ফেরেনি হাদিসুরের লাশ। এক বুক আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে অন্য নাবিকদের ফিরে আসা দেখছিল হাদিসুরের পরিবার। ছেলের লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন হাদিসুরের মা। অন্তত ছেলের লাশটা শেষবারের মতো দেখতে চান তার মা। 

দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে ইমিগ্রেশন ও বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বের হন ২৮ নাবিক। এদিকে সকাল থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন এসব নাবিকের স্বজনেরা। 

অন্তত ছেলের মরদেহ ছুঁয়ে দেখার আশা মেটাতে নীরব অপেক্ষায় রয়েছেন হাদিসুর রহমানের মা। তবে হাদিসুরের মরদেহ ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। নিহত হাদিসুরের মরদেহ বাড়িতে আসবে কি না, তা নিয়ে এখন শঙ্কা তাদের।

হাদিসুর রহমানের মা রাশিদা বেগম বলেন, ‘বাবায় কইছিলো আমারে বিদেশ নিয়া যাইবে, জাহাজ ঘুরাইয়া দেখাইবে। কিন্তু তা আর হইল না, আল্লাহ তারে নিয়া গেলো। আমার ছেলে তো আর বাইচ্চা নাই। এহন লাশটা যাতে পাইতে পারি সেজন্য সরকারের কাছে অনুরোধ রইল। আমার পোলারে আমি শেষ দেখা দেখতে চাই। লাশ না পাইলে আমার বাবার চিহ্নটাই থাকবে না।’

নিহত নৌপ্রকৌশলী হাদিসুর রহমান আরিফের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে। তিনি ওই এলাকায় নাদেরিয়া মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে হাদিসুর মেজো।

আরিফের বাবা আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলে তো আর নেই। বাবারে শেষ দেখা দেখতেও পারলাম না। আমাদের বাঁচার অবলম্বনটুকু শেষ। এখন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি, আমরা যেন আমাগো আরিফের লাশটা পাইতে পারি। ক্ষতি যা হওয়ার হইছে, এহন পোলার লাশটা আইন্না দ্যান আমনেরা।’

গত বুধবার মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন হাদিসুর। বাড়িতে এসেছিলেন মাস ছয়েক আগে। তবে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল তার। জানিয়েছিলেন, আটকে থাকা জাহাজ ছাড়া পেলে শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ওই দিন বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ রকেট হামলার শিকার হলে নিহত হন হাদিসুর রহমান আরিফ।

স্বজনেরা জানান, আট বছর ধরে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত ছিলেন আরিফ। বুধবার জাহাজ থেকে ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্সকে ফোন করেন তিনি। নেটওয়ার্ক না থাকায় জাহাজের ওপরে উঠে প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলার সময় জাহাজে একটি বিকট শব্দ হওয়ার পর আরিফের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আরিফের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স বলেন, ‘গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় সর্বশেষ ভাইয়ার সঙ্গে কথা হয়। রাশিয়ান সৈন্যদের হামলার সময় ভাইয়া বাইরে এসে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। কথা বলার সময় হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হয়। পরে কিছুই শুনতে পাইনি। আমার ভাই ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে মারা যান। আমার ভাইকে তো আর ফিরে পাব না, এখন আমরা শুধু লাশটা ফিরে পেতে চাই।’

বেতাগী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘‘আরিফ ২০১৮ সাল থেকে ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে ছিল। শ্রীলঙ্কা থেকে গত ১২ ডিসেম্বর সে ইউক্রেনের উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন, আরিফের মরদেহটি যেন দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয় এবং তার পরিবার যেন আর্থিক সহযোগিতা পায়।’’

ইত্তেফাক/এএএম