রাশিয়ার বেপরোয়া বোমাবর্ষণে রক্তাক্ত হয়েছে ইউক্রেনের একটি মা ও শিশু হাসপাতাল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হাসপাতালটি। অনেক শিশু হতাহত হয়েছে এবং কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে এসে গেছে রাশিয়ার বিশাল সামরিক বহর। তবে গত কয়েক দিন ধরে বহরটি নির্দিষ্ট একটি স্হানে থেমে আছে। তবে কী কারণে থেমে আছে তা নির্দিষ্ট করে জানা না গেলেও মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ধারণা, জ্বালানি সংকটের কারণে বহরটি থেমে থাকতে পারে। যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ৪০ মাইলব্যাপী এই সামরিক বহরটি থেমে থাকা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা তার আর নেই। এসব ঘটনার মধ্যেই আজ তুরস্কে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন রুশ ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। অন্যদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধবিমান পাঠাতে পোল্যান্ডের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পুতিন অবশ্যই ব্যর্থ হবেন এবং রাশিয়ার কৌশলগত পরাজয় ঘটবে।
শিশু হাসপাতালে রাশিয়ার বোমাবর্ষণ
ইউক্রেনের অবরুদ্ধ মারিউপোল শহরে একটি শিশু হাসপাতাল রুশ বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে বলে শহরটির পৌর কর্তৃপক্ষ এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছে। বুধবার বিকালে দেওয়া ঐ বিবৃতিতে কাউন্সিলের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, রুশ দখলদার বাহিনী শিশু হাসপাতালের ওপর কয়েকটি বোমা ফেলেছে। তিনি বলেন, এতে শিশু ও প্রসূতি বিভাগসহ হাসপাতালটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, হতাহতের সঠিক সংখ্যা তারা এখনো জানেন না। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালটির শিশু ও প্রসূতি বিভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে শহরটির পৌর কর্তৃপক্ষ ফেসবুকে এক বার্তায় জানান। ইউক্রেনের একজন এমপিও এ ঘটনার ভিডিও শেয়ার করেছেন।
ইউক্রেনের সামরিক প্রশাসন জানিয়েছে, হাসপাতালে হামলায় ১৭ জন আহত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেকে নিহত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে শিশুরা চাপা পড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। মারিউপোলে প্রতিদিনই রাশিয়া বোমাবর্ষণ করছে। এই শহরে সহস্রাধিক মারা গেছে। সেখানে গণকবর দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা জানিয়েছে, তারা জানতে পেরেছেন যে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্বাস্হ্য কেন্দ্রের ওপর ১৮টি হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে ১০ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছে। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ আরো বলছে, সংঘাতে এ পর্যন্ত ৫২ শিশু নিহত হয়েছে। কেবল শিশু হাসপাতাল নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ভবনেও হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী।
মারিউপোল শহরে একটি শিশু হাসপাতালের ওপর রুশ বোমাবর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ঘটনার ভিডিও ফুটেজসহ তিনি টুইট করেন, নৃশংসতা, ধ্বংসাবশেষের নিচে মানুষ, শিশুরা চাপা পড়েছে। তিনি অবিলম্বে ইউক্রেনের আকাশে ‘নো ফ্লাই জোন’ কার্যকরের জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের ক্ষমতা আছে কিন্তু আপনারা মানবতা হারিয়ে ফেলছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মা ও শিশু হাসপাতালে রুশ বোমা বর্ষণের কড়া নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনকে এই ভয়াবহ হামলার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বিভিন্ন শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে মস্কোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিনি নিশ্চিত যে প্রেসিডেন্ট পুতিন অবশ্যই ব্যর্থ হবেন এবং রাশিয়ার কৌশলগত পরাজয় হবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন যদি ইউক্রেনে তার পুতুল সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেন তাহলে আমি বলব তিনি সফল হবেন না।
ইউক্রেনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেসচুক বলছেন, যুদ্ধে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্হায় থাকা কিছু অঞ্চলের বেসামরিক মানুষদের পালানোর সুযোগ দিতে ১২ ঘণ্টার জন্য একটি যুদ্ধবিরতি করতে রাজি হয়েছে রাশিয়া। এগুলো হচ্ছে কিয়েভের কিছু অংশ, খারকিভ. চেরনিহিভ, সুমি ও মারিউপোল। এসব শহর থেকে বেরিয়ে যাবার মানবিক করিডোরগুলো গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা ছিল। এসব শহরে কয়েক লাখ লোক লড়াইয়ের কারণে খাদ্য, পানি, বিদু্যত্ ও ওষুধের অভাবের মধ্যে আটকা পড়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরে খাদ্যের জন্য লাইনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের ওপর বিমান হামলার ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করে দেখা উচিত। ঐ আক্রমণে বহু লোক নিহত হয়।
এদিকে বিদু্যত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চেরনোবিল পারমাণবিক বিদু্যত্কেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে ইউক্রেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্হা এনারগোটম তাদের এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সংস্হাটি জানায়, বিদু্যত্ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চেরনোবিল বিদু্যত্কেন্দ্রের পারমাণবিক জ্বালানি ঠান্ডা রাখা যাচ্ছে না। এখান থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের কারণে চেরনোবিল প্ল্যান্টের উচ্চ-ক্ষমতার বিদু্যত্ লাইনটি মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদু্যত্কেন্দ্রটি এখন রুশ বাহিনীর দখলে আছে।
