ভারতের জন্য দুই দিক সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে, ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও রাশিয়ার তেল

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৭

ভারতের বিপুল জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সস্তায় তেল কেনা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা, এই দুই লক্ষ্য এখন একসঙ্গে পূরণ করা দিল্লির জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনে সই করেছেন। এ আইন তাকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কিনবে, সেসব দেশের পণ্যের ওপর তিনি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাশিয়ার প্রধান আয়ের উৎস তেল ও জ্বালানি বিক্রি। মস্কোর এই আয় কমিয়ে আনাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।

শুল্ক কখন এবং কীভাবে বসানো হবে, তা মূলত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে কি না বা কবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়বে। দিল্লি এই আইনকে হুমকি হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এতে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ বাড়ছে। অথচ একই সময়ে ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির সম্ভাবনাও খুঁজছেন।

ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের হিসাবে, চলতি গ্রীষ্মে ভারতের আমদানিকৃত তেলের প্রায় অর্ধেক এসেছে রাশিয়া থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র বারবার রুশ তেল নিয়ে নীতি বদলেছে। ফলে ভারতকেও প্রতিবার কেনার পরিকল্পনা ও কৌশল পাল্টাতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছিল। তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের শুল্ক কমাতে রাজি হয়। বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে সম্মত হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করে দেয়। ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ভারতসহ কয়েকটি দেশকে রাশিয়া থেকে বেশি তেল কেনার অনুমতি দেয়, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণ হয়। এখন আবার ভারতকে শাস্তির হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কারণ তারা অনেক বেশি রুশ তেল কিনছে। অথচ বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া এখন সহজ নয়।

ভারত নতুন শুল্ক হুমকির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাজারের অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কেনা হবে এবং উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর কাজ চলবে। ভারত সতর্ক করে বলেছে, নতুন মার্কিন আইনের প্রভাব শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধে চাপ দিয়েছিল। পরে কূটনৈতিক পরিস্থিতি ও দামের পরিবর্তনের কারণে মার্কিন নীতি বদলে যায়। এখন ভারতকে একসঙ্গে দুটি বিষয় সামলাতে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কম দামে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ভূমিকায়। ভারত অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কিনলে শাস্তির হুমকি আসছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধের আগে ভারতের রান্নার গ্যাসের মাত্র ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসত। এখন তা ৫০ শতাংশের বেশি।

নয়াদিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের পরিচালক ও সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়। কিছু রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্যের দাম বাড়বে। নতুন আইন ট্রাম্পকে আগের সীমিত ক্ষমতার কিছুটা ফিরিয়ে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এখনো ঝুলে আছে। নতুন আইনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভারতের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শ্রীবাস্তবের মতে, চুক্তি সই করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। যুক্তরাষ্ট্র বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি করে পরে আবার শুল্ক ও শর্ত নিয়ে বিরোধ তৈরি করেছে। তাই নতুন আইন শুধু ভারতকেই নয়, অন্য দেশগুলোকেও ভাবাচ্ছে।

চীন প্রসঙ্গ
রাশিয়া থেকে ভারতের চেয়ে বেশি তেল কেনে চীন। নতুন আইন চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভারতের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এখন দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর যে চাপ দিচ্ছে, চীনের ওপরও কি একই রকম চাপ দেবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত বহু বছর ধরে চীনের শক্তি মোকাবিলার কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে।

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একসঙ্গে ছবি তোলেন। এটি পশ্চিমাদের বাইরের দেশগুলোর সহযোগিতার স্পষ্ট বার্তা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে সি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সি রাজা মোহন বলেছেন, ভারতকে দুটি অস্বস্তিকর বিকল্পের একটি বেছে নিতে হচ্ছে। ‘আপনি কি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনে পড়তে চান?’ চীনের শক্তি বাড়ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার যথেষ্ট কারণ আছে ভারতের। কিন্তু জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বারবার বদলাচ্ছে। এতে নয়াদিল্লিতে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কতদিন টিকবে?

অজয় শ্রীবাস্তবের পরামর্শ, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভারতের কোনো চুক্তি করা উচিত হবে না।

ইত্তেফাক/এবিএস