ফাঁসির মামলার শুনানি চলবে অবকাশকালেও 

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ০৯:৩৬

ফৌজদারি মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা। ডেথ রেফারেন্স মামলাও এর বাইরে নয়। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় ফাঁসির আসামিকেও বছরের পর বছর কাটাতে হচ্ছে কনডেম সেলে। অধিকসংখ্যক ফাঁসির মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয় সেই লক্ষ্যে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। বৈঠকে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালে এই প্রথমবারের মতো ফাঁসির মামলা (ডেথ রেফারেন্স) শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যে চলতি মাসের ২০ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত হাইকোর্টের ১১টি দ্বৈত বেঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি। এরই মধ্যে বেঞ্চ পুনর্গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

এদিকে অবকাশে ফাঁসির মামলার শুনানির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। কারণ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায়  দুটি পক্ষ যাতে দ্রুত বিচার পান সেজন্যই প্রধান বিচারপতি অবকাশে এতগুলো বেঞ্চ গঠন করে দিয়ে ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে ফাঁসির মামলার জট অনেকটাই হ্রাস পাবে।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার শুনানিকালে আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, সগিরা মোর্শেদ নামের এক নারী শিশু সন্তানকে আনতে গিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে খুন হন। হাইকোর্টের স্হগিতাদেশের কারণে সেই খুনের মামলার বিচার বন্ধ ছিল ২৮ বছর। এই দায়দায়িত্ব কি শুধু অন্য কারোর, নাকি আমাদেরও আছে? তিনি বলেন, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কেউ সন্তান, কেউ বাবা বা কেউ আপনজন হারিয়েছেন। ভিকটিম পরিবারের সদস্যদেরও তো বিচার পাবার অধিকার আছে। সে বিষয়টিও আমাদের দেখতে হবে। এছাড়া যারা কনডেম সেলে আছে তাদের কষ্টটাও আমাদের বুঝতে হবে। এমন তো হতে পারে কনডেম সেলে থাকা তাদের কেউ বিচারে খালাসও পেতে পারেন। তাই সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হচ্ছে এ ধরনের মামলা শুনানি করার।

প্রসঙ্গত, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক নিম্ন আদালতে কোনো মামলায় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে নথি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। এই ধারা মোতাবেক, যখন দায়রা আদালত থেকে কোনো মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়, তখন সেই মামলার যাবতীয় কার্যধারা হাইকোর্ট বিভাগে দাখিল করতে হয়। হাইকোর্ট বিভাগ থেকে সেই মৃত্যুদণ্ডাদেশকে নিশ্চিত করার আগ পর্যন্ত কারো দণ্ড কার্যকর করা যায় না।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, ২০১৫ সালে নিম্ন আদালত থেকে ১১৪টি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। আর আগের বছরগুলোর অনিষ্পন্ন ডেথ রেফারেন্স ছিল ৩৬৩টি। সব মিলিয়ে ২০১৫ সালে হাইকোর্টে বিচারাধীন ছিল ৪৭৭টি। ঐ বছর নিষ্পত্তি হয় ৫৮টি। অনিষ্পন্ন ছিল ৪১৯টি। ২০১৬ সালে ১৬১টি, ২০১৭ সালে ১৭১টি, ২০১৮ সালে ১৫৪টি, ২০১৯ সালে ১৬৪টি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। এই চার বছরে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৯৪টি। আর গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত হাইকোর্টে বিচারাধীন ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা ৭৭৫টি। গত দুই বছরের অধস্তন আদালতে বিপুলসংখ্যক আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অপরাধের গভীরতা বিবেচনায় নিয়ে বিচারকরা এই দণ্ড দিয়েছেন। সেই হিসেবে ডেথ রেফারেন্স মামলা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে হাইকোর্টে একটি দ্বৈত বেঞ্চ রয়েছে ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য। এর আগে তিনটি দ্বৈত বেঞ্চ ছিল। এই প্রথম অবকাশে এ ধরনের মামলা শুনানির জন্য ১১টি বেঞ্চ গঠন করে দিলেন প্রধান বিচারপতি। এ প্রসঙ্গে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বিচারপতি অ্যাডভোকেট মনসুরুল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান বিচারপতি এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডেথ সেলে অনেক আসামি বন্দি। অনেক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে আছে। এই সিদ্ধান্েতর ফলে স্বল্প সময়ে যদি ৩০/৪০টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয় সেটাও অনেক বড় পাওয়া।

ইত্তেফাক/কেকে