শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অনুভূতির অনুরণন: সংকট উত্তরণের সারথি

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ১৮:৪৯

যাপনের চক্রবাঁকে জীবনকে ব্যাঙ্গ করা, ভেতরের অন্ধকারকে ময়নাতদন্তের আদলে বুক চিতিয়ে নিরীক্ষণ করা কবি ও কবিতার দায়বোধ। এই দায়বদ্ধতা আরও বহুমাত্রিক এবং অনুপম হয়ে উঠে, যদি সেই কবি হন একজন রাজনৈতিক কর্মী, লড়াকু সাহসের অধিকারী। শেখ মাতিন মোসাব্বির এমন একজন আদর্শিক কর্মী। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নিজের চঞ্চলতা, বোহেমিয়ান জীবন এক কথায় অভ্যাস বিসর্জন দিয়ে নিজেকে নিবেদন করেছেন একজন বয়ে চলা নদী হিসেবে।

এ নদীতে আছে রাজনৈতিক সচেতনতা, ত্যাগ এবং আদর্শিক অনুরণনে সৃষ্ট প্রেম, দ্রোহ ও স্পর্ধা। এই বিস্তৃত অথচ ছোট্ট করে প্রকাশিত ক্যানভাসের বহিঃপ্রকাশ প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অনুভূতির অনুরণন’। যা পাঠকের হৃদ মাঝারে স্বপ্ন-বাস্তবতার বীজ বুনতে সহায়ক।

স্ট্যাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ তত্ত্বের নির্যাস অনুসারে, কোন আচরণ, কোন উদ্যোগ, এক কথায় কোন কিছুই বিক্ষিপ্ত সময়ের অংশ নয়। অর্থাৎ যেকোনো চিন্তা, পদক্ষেপ বা পরিকল্পনাই অতিবাহিত জীবনের শিক্ষা-সংস্কৃতির ফলাফল। এ হিসেবে ‘অনুভূতির অনুরণন’ কাব্যগ্রন্থে যে রাজনৈতিক জাগরণ, সচেতনতা ও আহ্বান তা কবির কোন আরোপিত জীবনাচরণ নয়, শব্দ খেলা নয়। বরং স্বীয় চিন্তায় সমাজের দৃশ্যমান রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও বৈভব, লোভকে খারিজ করার ফলাফল। ভেতরে-বাহিরের চৈতন্যদোয়ের তাড়না থেকে জানিয়েছেন,  ‘চেতনার সঙ্গে রক্তিম লালের শক্তি দিয়ে, চরম আঘাতের পর আঘার, সব জঞ্জাল সাফ হলো’।

অর্থাৎ, সমাজ ও জীবনের জঞ্জাল সরাতে নিজেকে শেষ সমর্পণের দীপ্ত প্রত্যয়, প্রস্তুতির শপথ জানিয়েছেন। সঙ্গে ইতিহাস প্রাণনে লড়াই, সংগ্রামের মাধ্যমেই যে প্রোথিত জঞ্জাল, অনাচার সাফ হয় সেই শিক্ষার কথা বলেছেন। বৃহত্তর অর্থে, এসবই বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক রাজনৈতিক চিন্তা-বাস্তবতার ফলাফল।

ধর্মীয় বিভেদের বেড়াজাল ভেঙেছেন সৃষ্টির প্রয়োজনে। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে উপাসনালয়গুলোকে আশ্রয়স্থল করেছেন ধর্মতত্ত্ব কবিতা দিয়ে।

‘সভ্যতা পদদলিত করে
ধর্মের নামে মানুষ হত্যা,
আজ সেখানে জীবন বাঁচাতে
উপাসনালয়গুলো আইসোলেশন সেন্টার’।

বহুমাত্রিক সহজিয়া বাঙ্গালির সংস্কৃতি এবং তার জাগরণ অনুভব করেছেন ‘লহু অনুরণন’ কবিতার লহরিতে। স্পষ্টতর করেছেন, আমি মুসলিম। কিন্তু, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর বহু মতবাদ আমার সংস্কৃতিতে, আমার রক্তে আমার রন্ধে। আমি বাঙ্গালি।

অর্থাৎ, বাঙ্গালির মূল সুরের আহবানে নিজের নৈতিক দায় এবং চর্চার আহ্বান করেছেন। যার যার অবস্থান থেকে ঐশ্বরিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদের সুরক্ষায় সংস্কৃতিই যে জন্য নিয়ামক এবং পাথেয় তাই বলে গেছেন।

সমাজ বদলের স্রোতে কবি সম্পর্কের জটিল সমীকরণ ও আহ্বানেও সাড়া দিয়েছেন। সংসার বাস্তবতায় অজস্র লড়াই সংগ্রামের জীবন শেষে নশ্বর জীবনের তাগিদে যে ক্ষয়ে যেতে হয়, নক্ষত্রেরও যে পতন ঘটে সেই বাস্তবতা মেনে আহ্বান করেছেন, ‘দেখে নিও, আমার সূর্য সন্তানের মুখ চেয়ে তৃপ্তি নিয়ে আমার না ফেরার দেশে চলে যাওয়া’।

আক্ষেপহীনভাবে মৃত্যুকে আহবান ও তাকে আলিঙ্গনের সাহসে পূর্ণ তৃপ্ততা নিয়ে শূন্যে ফিরে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন। এ যেন ঐশ্বরিক আগুনে নিজেকে লীন করবার প্রতিশ্রুতি, নিজেকে সিদ্ধ করবার প্রস্তুতি। সৃষ্টির আহ্বানে সৃজনশীল কর্ম আচরণের পরিসমাপ্তি টেনে আনা। বহুল জনপদের এই ভিড়ে এমন আহ্বান-আলিঙ্গন দুরূহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজম্ন মৃত্যু নিয়ে জ্ঞান-কবিতায় শব্দের খেলা খেলেছেন। কিন্তু তিনিও মৃত্যুকে দোরগড়ায় বুঝতে পেরে অযুত মননে রচনা করেছেন, ‘এ পথের শেষ কোথায়’?

এ জনম শুধুই দেবার, নেওয়ার নয়। আর এই বোধ যে নির্মোহ, নির্লিপ্তভাবে বিমূর্ত জীবনকে ছাড়িয়ে যায় তার প্রমাণ মেলে কবির আরেক রচনা ফানুস কবিতায়।

‘আমার নাম ফানুস।
বুকে আগুন আর রঙ্গের বর্ণিল
সাজ আমার, নিজে পুড়ে শেষ
হয়ে তোমাদের আনন্দ দেয়ার
জন্য আমার সৃষ্টি’।

জীবনকে অন্যের জন্য মুক্ত আকাশ আর আগুনের হলকায় আনন্দের উঠোনে নিয়ে যাওয়াতেই আনন্দ। আদতে এটি রূপকার্থে প্রকাশিত। মূলত এই আহ্বানে কবি সৃষ্টির প্রয়োজনে নিজেকে নিঃশেষ এবং নিবেদনের তাগিদ এবং তরিকার সন্ধান দেবার চেষ্টা করেছেন।

প্রেমের একান্তে আহ্বানে ঈর্ষার, আনন্দের। মনের গহীনের অনুভব-ধ্বনি মতে, তা একক ও অংশীদারিত্বহীন। নিজের অধিকারের বাগানে বাতাস কিংবা কীট-পতঙ্গের প্রতিনিধি মশাও যে সহ্যের বাইরে তার উল্লেখ ‘তুমি আমার এবং আমার’ এ, ‘ঐ যে সেদিন বাতাস তোমার চুলগুলো এলোমেলো করছিল একদম সহ্য হয়নি তা আমার। ঐ চুলে হাত দেয়া, বিলি কাটা শুধুই আমার অধিকার, মশাটাকে শত্রু মনে হয়, কেন তোমার গালে বসবে ও’?

যা প্রেম এবং প্রেমিকের প্রতি এক সরল অথচ প্রগাঢ় অধিকার প্রকাশ করে। কবি শেখ মাতিন মোসাব্বিরের ‘অনুভূতির অনুরণন’কে গভীর বিশ্লেষণ কিংবা নিরীক্ষায় সামাজিক শৃঙ্খলে বদল এবং নিবেদনের আহ্বান প্রকাশিত। একে তাত্ত্বিক রচনায় নিতে চাইলে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই লেখার উদ্দেশ্য সেটা নয়। বরং তার রচনায় অনুরণিত হয়ে কবি ও কবির কবিতার প্রতি নিবেদন প্রদর্শন। পাশাপাশি সমকালীন বাস্তবতায় এই কাব্যগ্রন্থের পাঠ যে জরুরি তাও কিছুটা সামনে আনা। কারণ এই রচনায় একজন কবির জীবন-যুদ্ধে টিকে থাকা, টানা-পোড়ন এবং জিতে যাওয়ার শৈল্পিক ক্যানভাস। কবির ক্যানভাস মানে সমাজের প্রতিবিম্ব, প্রতিফলন। তাই যাপন সমুদ্র বুঝতে ও লড়তে এই শব্দের নদী-জলে স্নানের বিকল্প নেই।

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
[email protected]

ইত্তেফাক/এএএম